পুকুরে নেমে সাঁতার শেখা – ছেলেবেলার স্মৃতিময় মধুর কাহিনী

বাড়ির পাশে যে ছোট্ট পুকুরটা ছিল, তার চারপাশে গাছপালায় ছাওয়া নরম ছায়া আর ঝিঁঝিঁ পোকার শব্দে বিকেলটা যেন একটু বেশিই মায়াময় হয়ে উঠত। শহরের ছেলেমেয়েদের কাছে পুকুর মানে হয়তো দূরের কোনো দৃশ্য, কিন্তু যারা নব্বই দশকে গ্রামে বা মফস্বলে বড় হয়েছে, তাদের কাছে পুকুর ছিল এক আবেগের নাম। সেই পুকুরেই প্রথম সাঁতার শেখা, প্রথম পাড়ে দাঁড়িয়ে জল ছিটানো কিংবা বন্ধুদের সাথে ডুবে-উঠে খেলাধুলার যে স্মৃতি, তা এক জীবনের সঞ্চয়। বড়রা বলত, সাঁতার না জানলে মানুষ জলে পড়ে মরবে। কিন্তু ছোটদের কাছে সেটা ছিল একটা সাহসিকতার চরম পরীক্ষা। আর যে দিন প্রথম ডুবে না গিয়ে ভেসে ওঠা সম্ভব হতো, সেদিন মনে হতো পৃথিবীর সব পুরস্কার জিতে ফেলেছি।

পুকুরে নামার প্রথম দিনটা আজও স্পষ্ট মনে পড়ে। মায়ের কড়া নিষেধের ফাঁক গলে এক দাদা হাত ধরে নিয়ে গিয়েছিল সেই পুকুরঘাটে। গা ছমছমে অনুভূতি নিয়ে ধীরে ধীরে নেমে গিয়েছিলাম কাদামাটির সিঁড়ি বেয়ে। সেই সিঁড়ির কাদায় পা ডুবে যেত, আর একটু এগোলে জল কোমর পর্যন্ত উঠত। বুক ধড়ফড় করত, কারণ আশেপাশে সবাই কেমন স্বচ্ছন্দে জলে খেলছে, কেউ কেউ মাথা ডুবিয়ে আবার ওপরে উঠে হাসছে, অথচ আমার মনে হচ্ছিল—এই তো বুঝি ডুবে যাব। কিন্তু দাদা পেছন থেকে বলল, “ভয় পাস না, আমি আছি।” সেই একটা কথায় ভরসা পেয়ে জলে একটু ভেসে থাকার চেষ্টা করলাম। মনে হলো শরীর হালকা হয়ে যাচ্ছে, কিন্তু পরমুহূর্তেই ডুবে গিয়ে চোঁখ-মুখে জল ঢুকে গেল। চোখ খোলার সময় হঠাৎ মনে হয়েছিল, এ বুঝি শেষ, কিন্তু দাদা টেনে তুলেছিল আবার ওপরে।

ছোট ছোট বাচ্চারা অনেক সময় ধরে পুকুরে গোসল করত। চোখ লাল হয়ে যেত। আমরা ফুটবল নিয়ে খেলা করতাম। কে কাকে ছুড়ে মারতে পারে। এভাবে মাঝে মাঝে ২-৩ ঘন্টা চলে যেত। এরপর দেখা যেত কারো কারো মা এসে লাঠি নিয়ে তারা করছে। আর বলছে, তারতারি উঠ!

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

এরপর প্রায় প্রতিদিন বিকেলে পুকুরে যাওয়ার অভ্যাস হয়ে গেল। প্রথম কয়েকদিন শুধু ধারে ধারে জল ঠেলে চলা, দুহাতে চুইয়ে চুইয়ে এগোনো। কেউ কেউ বাঁশের বোঁকা ধরে প্র‍্যাকটিস করত, আবার কেউ দড়ি বেঁধে সাঁতার কাটার চেষ্টা করত। আমাদের গ্রামের নিয়ম ছিল—যার সাঁতার শেখা হয়নি, সে ‘মুর্গি সাঁতার’ দিয়ে শুরু করবে। মানে, শুধু হাত দিয়ে জল ঠেলে কোনো রকমে ভেসে থাকা, পা প্রায় নাড়ানোই হয় না। আর যেদিন প্রথমবার কেউ একদিক থেকে অন্যদিকে পুকুর পার হয়ে যেত, সেদিন তাকে ‘পুরোদস্তুর সাঁতারু’ হিসাবে মানা হতো। আর এমন এক দিন আমার জীবনেও এসেছিল।

যেদিন আমি প্রথম পুকুরের মাঝখান পর্যন্ত গিয়েছিলাম, সেটা ছিল এক নিঃসঙ্গ দুপুর। কেউ ছিল না পাশে, শুধু নিজের সাহসে নেমেছিলাম। ভাবছিলাম, “আজ একটু বেশি চেষ্টা করি।” একটু একটু করে সামনে এগিয়ে যাচ্ছিলাম, পেছনে তাকিয়ে দেখি ঘাট অনেক দূরে। ভয় লাগছিল, কিন্তু মনে হচ্ছিল—এটাই সুযোগ। একটা গভীর শ্বাস নিয়ে দু’হাত ছুঁড়ে এগোলাম, আর তখনই টের পেলাম, আমি জলের ওপরেই ভাসছি। এই ভেসে থাকা মুহূর্তটা যেন সময়কে থামিয়ে দিয়েছিল। কেউ দেখছিল না, কেউ বাহবা দিচ্ছিল না, তবু মনে হচ্ছিল যেন আকাশ থেকে কেউ বলছে—“তুমি পেরেছো।”

সাঁতার শেখার সময় শুধু শরীর নয়, মনও ধীরে ধীরে সাহসী হয়ে উঠেছিল। আর সেই সাথে পুকুরের সাথে গড়ে উঠেছিল এক অদ্ভুত আত্মিক সম্পর্ক। পুকুর ছিল আমার বিকেলের বন্ধু, কখনো দুপুরের লুকানো আশ্রয়, কখনো চুপচাপ কান্নার সাথি। ক্লান্ত মনে শুধু পায়ের পাতায় জল ছুঁয়ে বসে থাকতাম কখনো কখনো। কেউ বুঝত না, ওই জলে কত কিছু ধুয়ে যেত—ভয়, দুঃখ, ক্লান্তি, একাকিত্ব। শহরের সুইমিং পুলে হয়তো শরীর শীতল হয়, কিন্তু পুকুরের জল মনকেও ঠান্ডা করে দেয়।

আমাদের গ্রামের সেই পুকুরে সাঁতার শেখার গল্পে মিশে আছে আরো অনেক চরিত্র। কখনো পাড়ার এক বয়স্ক কাকু আমাদের হাত ধরে শেখাতেন, কখনো পাশের বাড়ির ভাইটা চুপিচুপি নতুন টেকনিক দেখাতো। কেউ ডাইভ দিতে গিয়ে পেটের ওপর পড়ে হেসে উঠত, কেউ আবার ভয় পেয়ে উঠে আসত তাড়াতাড়ি। মেয়েরা একটু লাজুক হতো, তারা খুব সকালে বা সন্ধ্যায় পুকুরে নামত, কেউ কেউ আবার শাড়ি পরে কায়দা করে সাঁতার কাটত—সেই দৃশ্যগুলো এখনো চোখে ভাসে। সাঁতারের চেয়েও বড় ছিল সেই বিকেলের একসাথে থাকা, সেই গরম দুপুরে ঘামের সঙ্গে জলের মিশে যাওয়া, সেই কচি ডাক আর অল্প ভয়ের মধ্যে খুঁজে পাওয়া আনন্দ।

স্মৃতির পুকুরগুলো এখন হয়তো কুয়াশায় ঢেকে গেছে। অনেক জায়গায় ভরাট হয়ে উঠেছে বাড়ি, পাকা রাস্তা, দোকান। সেই ঘাটের কাদা, সেই ডুবে গিয়ে ওপরে ওঠা আর বুক ধড়ফড়ানো, এখন আর পাওয়া যায় না। এখন হয়তো আমরা শীতাতপ নিয়ন্ত্রিত সুইমিং পুলে গিয়ে দক্ষ প্রশিক্ষকের হাতে সাঁতার শিখি, নির্দিষ্ট সময় আর কোচিংয়ের নিয়মে। কিন্তু সেই পুকুরের জল, সেই ভয় আর সাহসের খেলা, সেটা আর ফিরে আসে না। আমরা সাঁতার শিখে গিয়েছি, কিন্তু সেই বিকেল আর সাঁতার শেখার আনন্দটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে।

আজ যারা সাঁতার শেখে, তারা নির্ধারিত সময়ে সেশন নেয়, তাদের জন্য লাইফগার্ড থাকে, ফ্লোটার দেওয়া হয়। তারা হয়তো কখনো বুঝবেও না, একটা বাচ্চা ছেলের বা মেয়ের জন্য পুকুরে একা নামার কী সাহস দরকার হতো, আর সেই সাহস দিয়ে জলে ভেসে ওঠার মুহূর্তটা কতখানি জীবনের শিক্ষা ছিল। যে দিন প্রথম ভেসে উঠেছিলাম, সেদিনের আনন্দের সাথে কোনো পরীক্ষার নম্বর, কোনো পদক বা সার্টিফিকেটের তুলনা হয় না।

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে

আমার সন্তানেরা হয়তো কোনোদিন সেই পুকুর দেখবে না, যেখানে আমি সাঁতার শিখেছিলাম। তারা জানবেও না, এক সময় বিকেলে বাবারা কাঁধে গামছা নিয়ে ঘাটে যেত, আর ফিরে আসত গা ভর্তি জল আর চোখে হাসি নিয়ে। পুকুর আমাদের শুধু সাঁতার শেখায়নি, আমাদের শিখিয়েছে ভয় জয় করতে, সঙ্গী খুঁজতে, আর সময়ের সাথে নিজেকে ভাসিয়ে দিতে।

তাই আজও যখন কোনো পুরনো পুকুর দেখি, চুপচাপ দাঁড়িয়ে থাকি তার ধারে। কানে বাজে সেই দিনের জল ছপছপ শব্দ, চোখে ভেসে ওঠে দাদা পেছনে দাঁড়িয়ে বলছে—“ভয় পাস না, আমি আছি।” আর তখন বুঝি, পুকুরে সাঁতার শেখা মানে শুধু শারীরিক কৌশল নয়, এটা ছিল সাহস, বিশ্বাস আর নিজের মধ্যে নিজেকে খুঁজে পাওয়ার এক অনন্য অভিজ্ঞতা।


Last Update: 8 months ago

 

Casio Original Calculator

Casio Original Calculator

পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর

About মহসিন উদ্দিন 30 Articles
মহসিন উদ্দিন একজন ব্লগার। ‍যিনি ২০১৩ সাল থেকে ব্লগিং করেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.