আমাদের সময়টা ছিল এক রকম ‘বিচিত্র সময়’। আমরা যারা ৯০ দশকে জন্মেছি, তারা বড় হয়েছি এক অদ্ভুত সন্ধিক্ষণে—যেখানে পুরনো আর নতুন যুগের হাতছানি ছিল পাশাপাশি। আমাদের শৈশব কেটেছে খোলা মাঠে, বাঁশঝাড়ের পাশে, পুকুরঘাটে বসে ঘন্টার পর ঘন্টা গল্প করে। কেরোসিনের আলো আর হ্যারিকেনের নিচে বসে পড়াশোনা করেছি আমরা, আবার ঠিক সেই আমরাই প্রথম হাত রেখেছি ইন্টারনেট নামক এক অদ্ভুত বিষয়ের ওপর। সেই সময়টায় ফোন মানেই ছিল বাটন ফোন, মোবাইল বলতে নকিয়া, সিমেন্স, কিংবা মটোরোলা। আর প্রযুক্তির যতোটা সুবিধা আমরা পেয়েছি, ঠিক ততোটাই কল্পনার ডানায় ভর করে বেড়ে উঠেছি আমরা। তবে আমাদের ভয়ের সংজ্ঞাও ছিল একটু আলাদা। আমরা ভূতের ভয় পেতাম, কিন্তু সেই ভয়ের মধ্যেই ছিল এক ধরণের টান। সন্ধ্যা নামার পর গ্রামের কাঁচা রাস্তা ধরে কেউ একা ফিরতে চাইতো না, বাঁশবনের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা বড়সড় গাছটা রাতের বেলা যেনো হঠাৎ করেই অন্য কিছুতে রূপ নিতো। এই ভয়গুলো বাস্তব না হলেও, আমাদের মনে গেঁথে যেত ঠিকই। আর সেই ভয়কেই যেন নতুন এক মাত্রা দিয়েছিল রেডিও ফূর্তির ‘ভুত এফএম’।
রাত এগারোটা ঊনষাট মিনিটে, ৮৮.০ এফএম-এ এক রহস্যময় জগতের দরজা খুলতো। ‘ভুত এফএম’ নামক একটি অনুষ্ঠান, যেটা রাত জেগে শোনা হতো, চোখ বন্ধ করে কল্পনার গভীরে ডুবে যাওয়া হতো, আর শীতের রাতে লেপের নিচে গা শিউরে ওঠা অনুভব করতো সবাই। গ্রামে তখনো বিদ্যুৎ সম্পূর্ণ নিয়মিত হয়নি। অনেক সময়ই রাত আটটার পর পুরো গ্রাম অন্ধকারে ডুবে থাকতো। সেই অন্ধকারে, মশারির ভেতর, এক বিছানায় গাদাগাদি করে শুয়ে থাকা পাঁচ-ছয়জন কিশোর, হাতে ছোট একটি রেডিও, কান লাগিয়ে শুনছে ‘আজকের গল্পটি পাঠিয়েছেন রাজশাহীর রুবেল…’। এই লাইনটির পর মুহূর্তেই নিস্তব্ধতা নেমে আসতো। কেউ কথা বলতো না। কেউ ঘুমাতো না। রেডিও থেকে যে ভয়ংকর কণ্ঠ শোনা যেতো, যে অজানা কারো অভিজ্ঞতার কথা বলা হতো, সেগুলোর সত্যতা যাচাইয়ের প্রশ্ন আসতো না। আমরা শুধু বিশ্বাস করতাম, আর ভয় পেতাম।
আমাদের এক Cousin ছিল, জুয়েল ভাইয়া। সে-ই প্রথম এই ‘ভুত এফএম’-এর কথা শুনিয়ে ছিল। প্রথমে কেউ বিশ্বাসই করেনি যে, রেডিওতে এই ধরণের অনুষ্ঠান হয়। তখন রেডিও মানেই ছিল গান, নিউজ, কিংবা ক্রিকেট কমেন্ট্রি। একরাতে সে আমাদের বললো—“আজ রাত এগারোটায় একটা ভয়ংকর অনুষ্ঠান হবে, শুনবি নাকি?” আমরা একসাথে ছিলাম তখন, শীতকালের রাত, বিদ্যুৎ নেই। রেডিও চালিয়ে দিলাম। প্রথমে কিছুই বুঝলাম না। একটু পর শুরু হলো, এক মহিলা খুব স্বাভাবিক কণ্ঠে বলছেন—“আমি তখন নতুন বউ, প্রথম রাতে একটা অদ্ভুত ছায়া ঘরের জানালার পাশে দাঁড়িয়ে ছিল…”। এরপর যা বলা হলো, তা আমাদের হৃদপিণ্ড পর্যন্ত ঠাণ্ডা করে দিলো। আমরা সবাই একসাথে ছিলাম বটে, কিন্তু কারো চোখে চোখ পড়লেই যেন আরও ভয় পেতাম। শব্দ করে কেউ কাশি দিলেই লাফিয়ে উঠতাম। আর প্রতিবার কেউ বলতো—“দোস্ত, এইবার তো সত্যি কিছু একটা আছে মনে হচ্ছে…”। আমরা একেবারে ভয়ে জমে যেতাম।
GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।
শুনতে অদ্ভুত শোনালেও, আমরা আসলে ভয় পেতে ভালোবাসতাম। ওই বয়সটায়, যখন কল্পনা শক্তি থাকে প্রবল, বাস্তব আর অবাস্তবের সীমারেখা মিলিয়ে যায়—তখন ভূতের গল্প শোনা ছিল এক রকম অভিজ্ঞতা। আমরা ভয় পেতাম ঠিকই, কিন্তু পরদিন দুপুরে ঠিক আবার সেই রাতের গল্প নিয়ে আলোচনা করতাম। কে কখন ভয় পেয়েছে, কে কাঁপছিল, কার হাত ঘামছিল—সব কিছু নিয়েই চলতো হাসি-ঠাট্টা। এক বন্ধু, মাসুম, একবার এমন ভয় পেয়ে গিয়েছিল যে মাঝরাতে বিছানা থেকে উঠে বাইরে বেরিয়ে গিয়েছিল পানি খেতে, কিন্তু বারান্দার ছায়া দেখে চিৎকার দিয়ে কেঁদে ফেলেছিল। সে বলেছিল—“দেখছিলাম, সাদা কাপড় পরা কেউ বসে আছে!” আমরা যদিও ওকে বারবার বলেছিলাম, “ওটা মশারির ছায়া হবে”, তবুও সে আর কখনো মাঝরাতে রুম থেকে বের হয়নি।
রেডিও ফূর্তির সেই অনুষ্ঠানটা ছিল শৈল্পিকভাবে নির্মিত। শুধু ভয় ধরানোর জন্য নয়, গল্পের ভেতরে এক ধরণের আবেগ, নাটকীয়তা এবং নাটকীয় ভয় ছিল। কখনো কোনো গল্প বাস্তব মনে হতো, কখনো মনে হতো বানানো, কিন্তু সব গল্পই আমাদের মনকে আলোড়িত করতো। গল্পের ভেতরে ব্যবহৃত শব্দ, ব্যাকগ্রাউন্ডে হালকা বাতাসের শব্দ, কারো হাঁটার আওয়াজ, কারো কাঁপা কণ্ঠে কিছু বলা—এইসব কিছু মিলিয়ে যেন এক থ্রিলিং অনুভব তৈরি হতো। কোনো গল্পে বলা হতো, কেউ বাসায় একা ছিল, বারান্দা থেকে আচমকা কারো গলার আওয়াজ আসে। কেউ বলতো, ঘরের আয়নার মধ্যে ভিন্ন চেহারার প্রতিবিম্ব দেখে চিৎকার করে ওঠে। এমনকি এমন গল্পও ছিল, যেখানে কেউ সরাসরি ‘ভুত এফএম’ শোনার সময় অদ্ভুত কিছু অনুভব করেছে। আমাদের কাছে এইসবই ছিল সত্যের চেয়েও বেশি কিছু—যা অনুভব করা যেতো, বোঝা যেতো না।
তখন ইন্টারনেট ছিল, কিন্তু খুব সীমিত। গ্রামে একটিমাত্র সাইবার ক্যাফে ছিল, যেখানে ঘন্টা প্রতি বিশ টাকা করে সময় কাটানো যেতো। ফেসবুক তখনো তেমন জনপ্রিয় হয়নি। ইউটিউবের কথা অনেকেই জানতো না। স্মার্টফোন নামক জিনিস তখনো হাতে আসেনি আমাদের। একজনে ফোন কিনলে, পুরো পাড়া সেই ফোন দেখতে আসতো। ফোনে গান শোনা, ছবি তোলা—এসব ছিল দুর্লভ বিষয়। আমাদের বিনোদন ছিল এই রেডিও, এই গলা কাঁপানো ভয়, এই গল্প শোনার অন্ধকার অভিজ্ঞতা। কেউ কেউ কপি করে সেই অনুষ্ঠানগুলো ক্যাসেট বা মেমোরি কার্ডে রেখে দিতো, যাতে পরে শোনা যায়। কিন্তু ‘লাইভ শোনার’ অভিজ্ঞতা ছিল সম্পূর্ণ আলাদা। সেই রাত, সেই শীত, সেই একসাথে থাকা—এই অভিজ্ঞতা আর কোনোদিন ফিরে আসবে না।
আজ সবকিছু বদলে গেছে। এখন ঘরে ঘরে ওয়াইফাই, হাতে হাতে স্মার্টফোন, রাতে ঘুমানোর আগে সবাই মোবাইলে চোখ গুঁজে বসে থাকে। ভুতের গল্প এখনও আছে, ইউটিউবে হাজারো হরর স্টোরি পাওয়া যায়, স্পটিফাইয়ে পডকাস্ট, নেটফ্লিক্সে সিনেমা—কিন্তু সেই “একসাথে শুয়ে শুয়ে ভয় পাওয়ার” অভিজ্ঞতা আর নেই। এখন সবাই একা। হেডফোন কানে দিয়ে গল্প শোনে, কেউ পাশে নেই, কেউ ভয় পেলে জড়িয়ে ধরার মতোও কেউ নেই। তবুও, মাঝে মাঝে যখন শীতের রাতে হঠাৎ বিদ্যুৎ চলে যায়, বাইরে বাতাস জোরে বইতে থাকে, জানালার কাঁচ কেঁপে ওঠে—তখন যেন মনে পড়ে সেই পুরনো দিনগুলোর কথা। মনে পড়ে, কিভাবে আমরা ভয়কে বন্ধু বানিয়ে নিয়েছিলাম, কিভাবে একটি রেডিও অনুষ্ঠান আমাদের রাতের ঘুম কেড়ে নিতো আবার একই সঙ্গে আমাদের বন্ধনকে দৃঢ় করতো।
এইসব স্মৃতি আসলে শুধুই স্মৃতি নয়, এগুলো আমাদের বেড়ে ওঠার অংশ। ‘ভুত এফএম’ শুধু একটি রেডিও প্রোগ্রাম ছিল না, এটি ছিল আমাদের কৈশোরের এক গা শিউরে ওঠা অধ্যায়, যেখানে ভয় ছিল, হাসি ছিল, বন্ধুত্ব ছিল, আর ছিল অজানা রহস্যের প্রতি এক অসীম আগ্রহ। আজ হয়তো আমরা বড় হয়েছি, অনেক কিছু জেনে গেছি, যুক্তিবাদী হয়ে গেছি—কিন্তু মন এখনো সেই পুরনো একরাতের শীতল বাতাসে ফিরে যেতে চায়, যেখানে লেপের নিচে মুখ গুঁজে শুয়ে, ৮৮.০ এফএমে ভেসে আসা কারো কাঁপা কণ্ঠে শোনা যেত—“এই গল্পটি সত্য… আমি নিজ চোখে দেখেছি…”
Last Update: 8 months ago
LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light
এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে
Casio Original Calculator
পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর
Leave a Reply