প্রতিটি মানুষের শৈশব রঙ্গিন হয়। সেই সব স্মৃতির কথা মনে পড়লে মনটা আজও ভারী হয়ে যায়। দুর্গা পূজার সেই স্মৃতিময় দিনগুলো তার মধ্যে অন্যতম। সেই দিনগুলোর কথা ভাবলেই আজও মনে হয়—যদি আবার সেই সময়টায় ফিরে যেতে পারতাম!
শরৎ এলেই যেন পুরো পৃথিবীটাই বদলে যেত। আকাশটা হয়ে উঠত অদ্ভুত নীল, তার মাঝে ভেসে বেড়াত তুলোর মতো সাদা মেঘ। হালকা বাতাসে কাশফুল দুলত, আর সেই দৃশ্য দেখলেই মনে হতো—পূজা আসছে। ছোটবেলায় এই একটা সময়ের জন্যই যেন আমরা সারা বছর অপেক্ষা করতাম। তবে পূজার আসল আনন্দটা শুরু হতো অনেক আগেই—পূজার কেনাকাটা দিয়ে।পূজার প্রায় দুই সপ্তাহ আগে থেকেই আমাদের বাড়িতে এক ধরনের ব্যস্ততা শুরু হয়ে যেত। মা আলমারি খুলে পুরনো কাপড় গুছিয়ে রাখতেন, আর বারবার বলতেন, “এইবার কিন্তু ভালো করে কিনতে হবে।” আমরা ভাইবোনেরা তখন থেকেই উত্তেজনায় অস্থির হয়ে যেতাম। কোন জামা নেব, কী রঙ নেব—এসব নিয়ে নিজেদের মধ্যেই পরিকল্পনা চলত। বাবা অফিস থেকে ফিরেই বলতেন, “চলো, কাল বাজারে যাবো।” সেই একটা কথাই আমাদের রাতে ঘুমোতে দিত না।
পরের দিন সকালে আমরা সবাই খুব তাড়াতাড়ি উঠে পড়তাম। নতুন জামা কেনার আনন্দটাই আলাদা ছিল। বাজারে ঢুকলেই চারদিকে শুধু মানুষের ভিড় আর রঙিন কাপড়ের বাহার। দোকানগুলোতে লাইট জ্বলছে, মাইক দিয়ে গান বাজছে—সব মিলিয়ে এক অন্যরকম উৎসবের আবহ। মা একটার পর একটা জামা দেখে যাচ্ছেন, আর আমরা বলছি, “এইটা ভালো, না ওইটা ভালো?” দোকানদাররা হাসিমুখে দেখাচ্ছে, “এইটা নতুন ডিজাইন, এইটা খুব চলছে।” শেষ পর্যন্ত অনেক বাছাইয়ের পর যখন একটা জামা পছন্দ হতো, তখন মনে হতো যেন বড় কোনো যুদ্ধ জিতে গেলাম। বাড়িতে ফিরে নতুন জামাগুলো বারবার বের করে দেখা—এটাই ছিল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় কাজ। কখন পূজা আসবে, আর কখন সেই জামা পরবো—এই অপেক্ষাটা যেন আর শেষই হতে চাইত না। মাঝে মাঝে জামাটা পরে আয়নার সামনে দাঁড়িয়ে নিজেকে দেখতাম, আর মনে মনে ভাবতাম, “পূজার দিন আমি সবার থেকে সুন্দর লাগবো।”অবশেষে এল সেই মাহেন্দ্রক্ষণ—মহালয়ার সকাল। ভোরবেলা রেডিওতে চণ্ডীপাঠ শোনার সময়টা ছিল খুব বিশেষ। তখন মনে হতো, দেবী মা সত্যিই আসছেন। চারদিকে একটা পবিত্র অনুভূতি কাজ করত। এর পর থেকেই শুরু হয়ে যেত পূজার আসল দিনগুলো।
GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

ষষ্ঠীর দিন আমরা সবাই নতুন জামা পরে মণ্ডপে যেতাম। প্যান্ডেলগুলোতে রঙিন আলো, সুন্দর সাজসজ্জা আর দেবীর মূর্তি দেখে চোখ জুড়িয়ে যেত। বন্ধুদের সঙ্গে দেখা হতো, সবাই নিজেদের নতুন জামা দেখাতাম। কেউ বলত, “দেখ, আমারটা কেমন?” আবার কেউ বলত, “আমারটা কিন্তু বেশি সুন্দর!” এই ছোট ছোট কথাগুলোতেই আনন্দটা ছিল অপরিসীম।সপ্তমী, অষ্টমী, নবমী—প্রতিটা দিনই ছিল আলাদা আনন্দে ভরা। অষ্টমীর অঞ্জলি দেওয়ার সময় সবাই খুব সিরিয়াস হয়ে যেত, কিন্তু তার পরেই আবার শুরু হতো আড্ডা, খাওয়া-দাওয়া আর ঘোরাঘুরি। সন্ধ্যায় আরতির সময় ঢাকের শব্দ, ধূপের গন্ধ আর আলো—সব মিলিয়ে এক অপার্থিব পরিবেশ তৈরি হতো। সেই মুহূর্তগুলো যেন এখনো চোখের সামনে ভেসে ওঠে। নবমীর রাত ছিল সবচেয়ে জমজমাট। সেদিন আমরা অনেক রাত পর্যন্ত বাইরে থাকতাম। মণ্ডপ থেকে মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, ফুচকা খাওয়া, বন্ধুদের সঙ্গে হাসাহাসি—সবকিছু মিলিয়ে সময়টা যেন উড়ে যেত। মনে হতো, এই রাতটা যদি আর একটু লম্বা হতো!
কিন্তু যত আনন্দই হোক, দশমী এলেই মনটা কেমন যেন খারাপ হয়ে যেত। দেবী মায়ের বিদায়ের সময় চোখে জল চলে আসত। সিঁদুর খেলার দৃশ্য, ঢাকের বেদনার সুর—সবকিছু মিলিয়ে একটা অদ্ভুত আবেগ তৈরি হতো। মনে হতো, এত তাড়াতাড়ি সব শেষ হয়ে গেল কেন?বাড়ি ফিরে নতুন জামাগুলো গুছিয়ে রাখা হতো, আর আমরা আবার সেই আগের মতো স্বাভাবিক জীবনে ফিরে যেতাম। কিন্তু মনের মধ্যে থেকে যেত অসংখ্য স্মৃতি—পূজার কেনাকাটা, নতুন জামার গন্ধ, মণ্ডপের আলো, আর বন্ধুদের সঙ্গে কাটানো সেই হাসিখুশি মুহূর্তগুলো।
আজ বড় হয়ে বুঝি, সেই সময়গুলোই ছিল জীবনের সবচেয়ে নির্ভেজাল আনন্দের দিন। এখন হয়তো সবকিছুই আছে—কিন্তু সেই অনুভূতি, সেই অপেক্ষা আর সেই খুশিটা আর আগের মতো নেই। তবুও প্রতি বছর শরৎ এলেই মনে হয়—হয়তো আবার সেই দিনগুলো ফিরে আসবে, আবার আমরা ছোট হয়ে যাব, আর আবার শুরু হবে পূজার কেনাকাটা থেকে শুরু করে সেই অমলিন আনন্দের গল্প।
দশমীর বিষণ্নতা কেটে যেতে না যেতেই আমাদের মনে আবারও এক অদ্ভুত শূন্যতা নেমে আসত। মনে হতো, এতদিন যে আনন্দে দিন কেটেছে, হঠাৎ করে যেন সব থেমে গেল। কিন্তু সেই শূন্যতার মধ্যেও লুকিয়ে থাকত পূজার প্রতিটি দিনের ছোট ছোট স্মৃতি—যেগুলো আমরা বারবার মনে করে আবার হাসতাম, আবার আনন্দ পেতাম।
দশমীর পরের দিনগুলোতে আমরা বন্ধুদের সঙ্গে বসে পূজার গল্প করতাম। কে কোন দিন কী করেছে, কে কোথায় ঘুরতে গেছে, কার জামা সবচেয়ে সুন্দর ছিল—এসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক চলত ঘণ্টার পর ঘণ্টা। কেউ বলত, “আমার জামাটাই সেরা ছিল”, আবার কেউ হেসে বলত, “আরেহ, তোরটা তো আগের বছরের মতোই ছিল!” এই খুনসুটির মাঝেই আবার নতুন করে আনন্দ খুঁজে পেতাম আমরা। পূজার কেনাকাটার সময়ের কথাগুলো তখন আরও বেশি করে মনে পড়ত। সেই দোকানের ভিড়, বাবার সঙ্গে দরাদরি করা, মায়ের ধৈর্য ধরে সবকিছু দেখা—সব যেন সিনেমার দৃশ্যের মতো ভেসে উঠত চোখের সামনে। মনে হতো, এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল আসল আনন্দ। নতুন জামা পাওয়ার খুশি যেমন ছিল, তেমনি সেই জামা কেনার পুরো প্রক্রিয়াটাই ছিল এক বিশাল উৎসব।
আর একটা জিনিস ছিল, যেটা এখন খুব মিস করি—সেটা হলো পাড়ার একসঙ্গে পূজা করা। তখন আমাদের পাড়ার সবাই যেন এক পরিবারের মতো ছিল। পূজার সময় সবাই মিলে মণ্ডপ সাজানো, লাইট লাগানো, ফুল আনা—এসব কাজে আমরা ছোটরাও অংশ নিতাম। বড়রা কাজ করতেন, আর আমরা পাশে দাঁড়িয়ে দেখতাম, মাঝে মাঝে সাহায্য করার চেষ্টা করতাম। সেই মিলেমিশে কাজ করার আনন্দটা আজকাল খুব একটা দেখা যায় না। সন্ধ্যা হলেই পাড়ার মণ্ডপে ভিড় জমত। কেউ আড্ডা দিত, কেউ গান গাইত, আবার কেউ শুধু চুপচাপ বসে সবকিছু উপভোগ করত। মাঝে মাঝে ছোট ছোট সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠানও হতো—নাচ, গান, আবৃত্তি। আমরা আগ্রহ নিয়ে সেইসব দেখতাম, আর মনে মনে ভাবতাম, “একদিন আমরাও মঞ্চে উঠব।” সেই স্বপ্নগুলো হয়তো অনেক সময় পূরণ হয়নি, কিন্তু স্বপ্ন দেখার সেই সাহসটাই আমাদের অনেক কিছু শিখিয়েছে। খাবারের কথাও ভুলে গেলে চলবে না। পূজার সময় পাড়ায় বা মণ্ডপে যে প্রসাদ দেওয়া হতো—খিচুড়ি, লাবড়া, চাটনি—সেই স্বাদ আজও যেন জিভে লেগে আছে। এত সাধারণ খাবার, তবুও এত সুস্বাদু লাগত কেন, সেটা আজও বুঝি না। হয়তো আনন্দের সঙ্গে খাওয়ার জন্যই এমন লাগত।
LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light
এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে
আরো পড়ুন:-
- বন্ধুত্বের বন্ধন থাকুক ধর্ম-বর্ণ নির্বিশেষে
- ছেলেবেলার শৈশবের রমযান আহা কি সুন্দর মুহূর্ত!
- ছেলেবেলার ঈদ! সে কি আনন্দ ভরা দিন ছিল
পূজার সময় আমাদের আরেকটা প্রিয় কাজ ছিল—রাত জেগে প্যান্ডেল হপিং করা। বন্ধুদের সঙ্গে দল বেঁধে এক মণ্ডপ থেকে আরেক মণ্ডপে ঘুরে বেড়ানো, নতুন নতুন থিম দেখা, আর মাঝেমধ্যে রাস্তায় দাঁড়িয়ে ফুচকা বা চটপটি খাওয়া—এইসব মুহূর্তগুলো ছিল একেবারে অমূল্য। ক্লান্ত হয়ে গেলে রাস্তার ধারে বসে একটু বিশ্রাম নেওয়া, তারপর আবার হাঁটা শুরু—এই চক্রটাই চলত সারারাত। তবে সবকিছুর মধ্যেই একটা অদ্ভুত পরিবর্তন লক্ষ্য করতাম—পূজা যত এগোতো, সময় যেন তত দ্রুত চলে যেত। ষষ্ঠী থেকে সপ্তমী, তারপর অষ্টমী—মনে হতো চোখের পলকেই সব শেষ হয়ে যাচ্ছে। আর নবমীর পর থেকেই মনটা কেমন যেন ভারী হয়ে যেত। মনে হতো, এই আনন্দটা যদি আর একটু বেশি সময় থাকত!এখন যখন সেই দিনগুলোর কথা ভাবি, তখন বুঝতে পারি—আসল আনন্দটা ছিল না শুধু নতুন জামা বা ঘোরাঘুরিতে, বরং ছিল সেই নির্ভেজাল অনুভূতিতে। তখন কোনো চিন্তা ছিল না, কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না—শুধু ছিল আনন্দ আর ভালোবাসা।
আজ আমরা বড় হয়ে গেছি, সময় বদলে গেছে, জীবন অনেক বেশি ব্যস্ত হয়ে উঠেছে। তবুও শরৎ এলেই, আকাশে সাদা মেঘ ভাসলেই, কাশফুল দুললেই—মনে হয়, আবার সেই ছোটবেলার দিনগুলো ফিরে আসুক। আবার আমরা সেই ছোট্ট বাচ্চাটার মতো হয়ে যাই, যে পূজার কেনাকাটার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষা করত, আর নতুন জামা পরে হাসিমুখে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াত।হয়তো সময়কে ফিরিয়ে আনা সম্ভব নয়, কিন্তু স্মৃতিগুলোকে তো আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি। আর সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের বারবার মনে করিয়ে দেয়—জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো কখনো খুব বড় কিছুতে নয়, বরং ছোট ছোট আনন্দের মধ্যেই লুকিয়ে থাকে।
পূজা শেষ হয়ে যাওয়ার পরও আমাদের ভেতরের সেই উৎসবটা যেন একদম শেষ হতো না। দশমীর কয়েকদিন পর পর্যন্তও পাড়ার মাঠে গেলেই পূজার সেই গন্ধটা পাওয়া যেত—ধূপের হালকা গন্ধ, শুকিয়ে যাওয়া ফুলের পাপড়ি, আর ভাঙা প্যান্ডেলের কাঠামো। সেগুলো দেখলেই বুকের ভেতরটা কেমন যেন হালকা কষ্টে ভরে উঠত। মনে হতো, এখানেই তো কিছুদিন আগেও কত হাসি, কত আনন্দ ছিল!
একদিন বিকেলে আমি একা একা মণ্ডপের জায়গাটায় গিয়ে বসেছিলাম। চারদিকে নিস্তব্ধতা, কোনো ভিড় নেই, কোনো আলো নেই—শুধু ফাঁকা জায়গা। সেই জায়গাটার দিকে তাকিয়ে মনে হচ্ছিল, যেন কেউ হঠাৎ করে সব আনন্দ কেড়ে নিয়ে গেছে। ঠিক তখনই পেছন থেকে আমার এক বন্ধু এসে বলল, “কী রে, আবার পূজার কথা ভাবছিস?” আমি একটু হেসে বললাম, “হ্যাঁ রে… মনে হচ্ছে আবার যদি সব শুরু হতো!” আমরা দু’জন তখন সেই জায়গাটায় বসে অনেকক্ষণ গল্প করলাম। পূজার সময় কে কী করেছে, কার কী মজার ঘটনা ঘটেছে—সব মনে করে হাসছিলাম। একসময় মনে হলো, পূজা শেষ হয়ে গেলেও তার গল্পগুলো যেন শেষ হয় না। সেই গল্পগুলোই আমাদের আবার আনন্দ দেয়, আবার সেই দিনগুলোয় ফিরিয়ে নিয়ে যায়।
এরপর ধীরে ধীরে আবার স্কুল শুরু হলো। সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে স্কুলে যাওয়ার সেই পুরনো রুটিনে ফিরে আসতে একটু কষ্টই হতো। ক্লাসে বসে বইয়ের দিকে তাকিয়ে থাকলেও, মাথার মধ্যে শুধু পূজার স্মৃতিগুলোই ঘুরপাক খেত। স্যার কিছু জিজ্ঞেস করলে হঠাৎ করে বাস্তবে ফিরে আসতাম। বন্ধুরাও একই অবস্থায়—সবাই যেন একটু মনমরা, কিন্তু ভেতরে ভেতরে এখনো পূজার আনন্দটা ধরে রেখেছে। স্কুলে টিফিনের সময় আবার শুরু হতো পূজার আলোচনা। কে কোথায় ঘুরতে গেছে, কে কতগুলো নতুন জামা পেয়েছে—এসব নিয়ে আবার হাসাহাসি চলত। কেউ কেউ মোবাইলে ছবি এনে দেখাত, “এইটা দেখ, আমরা ওই মণ্ডপে গিয়েছিলাম।” তখন মনে হতো, পূজার আনন্দটা শুধু সেই কয়েকটা দিনের মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়, বরং তার প্রভাব অনেকদিন ধরে আমাদের সঙ্গে থেকে যায়।
এভাবেই দিন কেটে যেতে লাগল। কিন্তু একটা জিনিস বদলায়নি—শরৎ এলেই এখনো আমার ভেতরে সেই একই অনুভূতি জেগে ওঠে। আকাশে যখন সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল যখন হাওয়ায় দুলে—তখন মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে গেছি। আবার পূজার কেনাকাটার জন্য অপেক্ষা করছি, আবার নতুন জামা পরার স্বপ্ন দেখছি। এখন বুঝতে পারি, পূজা আসলে শুধু একটা উৎসব নয়—এটা একটা অনুভূতি, একটা আবেগ। এই আবেগটা আমাদের ছোটবেলার সঙ্গে, আমাদের স্মৃতির সঙ্গে গভীরভাবে জড়িয়ে আছে। তাই সময় যতই বদলাক, বয়স যতই বাড়ুক—দুর্গা পূজার সেই অনুভূতিটা কখনো বদলায় না। আজ যখন ছোট ছোট বাচ্চাদের দেখি পূজার সময় নতুন জামা পরে হাসছে, মণ্ডপে দৌড়াচ্ছে—তখন নিজের ছোটবেলার কথা মনে পড়ে যায়। মনে হয়, সময়টা শুধু বদলেছে, কিন্তু আনন্দটা একই রয়ে গেছে। তখন মনে মনে তাদের জন্য একটা প্রার্থনা করি—ওদের শৈশবটাও যেন এমনই সুন্দর স্মৃতিতে ভরে ওঠে, যেমনটা আমাদের হয়েছিল।হয়তো আমরা আর সেই দিনগুলোতে ফিরে যেতে পারব না, কিন্তু সেই দিনগুলোর গল্প আমরা বাঁচিয়ে রাখতে পারি। সেই গল্পগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়—জীবনের আসল সুখটা কোথায়। পূজার কেনাকাটা থেকে শুরু করে শেষ দিনের বিদায়—সবকিছু মিলিয়ে এই উৎসবটা আমাদের জীবনের একটা অমূল্য অংশ হয়ে থাকে। আর যতদিন এই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে থাকবে, ততদিন দুর্গা পূজার আনন্দও আমাদের ভেতরে বেঁচে থাকবে—নীরবে, গভীরভাবে, ভালোবাসার মতো করে।
দিনগুলো একটার পর একটা পেরিয়ে যায়, কিন্তু কিছু স্মৃতি কখনো পুরোনো হয় না। দুর্গা পূজার সেই দিনগুলো ঠিক তেমনই—যতই সময় যাক, মনে হয় সবকিছু যেন এখনো ঠিক আগের মতোই রয়ে গেছে। শুধু আমরা বদলে গেছি, আমাদের বয়স বেড়েছে, দায়িত্ব বেড়েছে—কিন্তু সেই শৈশবের অনুভূতিগুলো কোথাও গিয়ে থেমে আছে।এক বছর পূজার আগের সময়টা আমার কাছে আজও সবচেয়ে স্পষ্টভাবে মনে আছে। তখন আমি একটু বড় হয়েছি, তবুও সেই ছোটবেলার উচ্ছ্বাসটা একটুও কমেনি। এবার যেন পূজার প্রস্তুতিটা আরও আগে থেকেই শুরু হয়েছিল। মা বলছিলেন, “এইবার একটু আগে আগে কেনাকাটা শেষ করব, ভিড় এড়াতে।” কিন্তু আমরা তো জানি—ভিড়ের মধ্যেই আসল মজা!সেদিন আমরা বিকেলে বাজারে গেলাম। চারদিকে মানুষের ঢল, দোকানগুলোর সামনে লাইন, আর সেই চেনা কোলাহল—সবকিছু মিলিয়ে মনে হচ্ছিল, পুরো শহরটাই যেন এক বিশাল উৎসবের মাঠে পরিণত হয়েছে। আমি এবার নিজেই নিজের জামা পছন্দ করার চেষ্টা করছিলাম। ছোটবেলার মতো শুধু মায়ের ওপর নির্ভর না করে, নিজের পছন্দটা বোঝানোর চেষ্টা করছিলাম।অনেক ঘোরাঘুরির পর একটা নীল রঙের পাঞ্জাবি আমার খুব ভালো লেগে গেল। আমি মাকে বললাম, “এইটা নেবো।” মা একটু দেখে বললেন, “হ্যাঁ, খারাপ না।” বাবাও হাসিমুখে বললেন, “এইবার তো নিজের পছন্দে নিচ্ছিস!” সেই মুহূর্তটা আমার কাছে খুব বিশেষ ছিল—মনে হয়েছিল, আমি যেন একটু বড় হয়ে গেছি।

বাড়িতে ফিরে সেই পাঞ্জাবিটা আমি অনেক যত্ন করে রেখে দিলাম। আগের মতোই বারবার বের করে দেখতাম, কিন্তু এবার একটা নতুন অনুভূতি কাজ করছিল—নিজের পছন্দের জিনিস কেনার একটা আলাদা আনন্দ।অবশেষে পূজা এল। ষষ্ঠীর সকালে যখন সেই নতুন পাঞ্জাবিটা পরলাম, তখন আয়নায় নিজেকে দেখে মনে হচ্ছিল—এই আমি যেন আগের আমি নই, একটু বদলে গেছি। কিন্তু মনের ভেতরে সেই পুরনো উত্তেজনাটাই রয়ে গেছে।সেদিন আমরা সবাই মিলে মণ্ডপে গেলাম। চারদিকে আলো, মানুষের ভিড়, ঢাকের শব্দ—সবকিছু মিলিয়ে আবার সেই চেনা পরিবেশ। কিন্তু এবার আমি শুধু আনন্দ পাচ্ছিলাম না, বরং চারপাশটা একটু অন্যভাবে দেখছিলাম। ছোট ছোট বাচ্চাদের দৌড়াদৌড়ি, তাদের হাসি—সব দেখে মনে হচ্ছিল, এটাই তো ছিল আমার কিছুদিন আগের জীবন।
অষ্টমীর দিন অঞ্জলি দিতে গিয়ে হঠাৎ করেই মনে হলো, এই মুহূর্তটা হয়তো একদিন খুব মিস করব। ঢাকের শব্দ, ফুলের গন্ধ, প্রার্থনার সেই শান্ত পরিবেশ—সবকিছু যেন মনে গেঁথে নিতে চাইছিলাম। মনে হচ্ছিল, সময়টা একটু থেমে যাক। নবমীর রাতে আমরা আগের মতোই বন্ধুদের সঙ্গে বের হলাম। কিন্তু এবার হাসি-ঠাট্টার মাঝেও একটা অদ্ভুত অনুভূতি কাজ করছিল—যেন বুঝতে পারছি, এই দিনগুলো চিরকাল থাকবে না। আমরা সবাই একসময় বড় হয়ে যাব, এই নির্ভার সময়টা আর ফিরে আসবে না।আর অবশেষে এল দশমী। সেই চেনা বিদায়ের মুহূর্ত। ঢাকের বেদনার সুর, সিঁদুর খেলা, আর মানুষের চোখে জল—সবকিছু মিলিয়ে একটা ভারী আবেগ তৈরি হলো। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে ছিলাম, কিছু বলতে পারছিলাম না। মনে হচ্ছিল, এই মুহূর্তটা যেন শেষ না হয়।
প্রতিমা যখন ধীরে ধীরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছিল, তখন মনে হচ্ছিল—শুধু দেবী মা নয়, আমার শৈশবের একটা অংশও যেন ভেসে যাচ্ছে। বুকের ভেতরটা হালকা কষ্টে ভরে উঠেছিল।সেদিন বাড়ি ফিরে আমি একা একা আমার ঘরে বসে ছিলাম। নতুন পাঞ্জাবিটা খুলে রেখে দিলাম, আর কিছুক্ষণ চুপচাপ তাকিয়ে রইলাম। হঠাৎ করেই মনে হলো—এই জামাটা শুধু একটা জামা নয়, এটা একটা স্মৃতি। এই জামার সঙ্গে জড়িয়ে আছে সেই দিনের হাসি, আনন্দ, আর এক টুকরো শৈশব। এরপর থেকে অনেক বছর কেটে গেছে। এখন পূজা এলে আমি হয়তো আর সেই আগের মতো উত্তেজিত হই না। কেনাকাটাও হয়, মণ্ডপে যাওয়া হয়—কিন্তু কোথাও যেন একটা ফাঁকা জায়গা থেকে যায়।
মজুমদার আই.টিতে অনলাইন ও অফলাইন কোর্সে ভর্তি চলছে। বিস্তারিত দেখুন:
তবুও, যখন শরতের আকাশে সাদা মেঘ ভাসে, কাশফুল দুলে—তখন মনে হয়, আমি আবার সেই ছোট্ট ছেলেটা হয়ে গেছি। আবার পূজার কেনাকাটার জন্য অপেক্ষা করছি, আবার নতুন জামা পরে মণ্ডপে ঘুরে বেড়াচ্ছি।সময়ের সঙ্গে অনেক কিছু বদলে যায়, কিন্তু কিছু অনুভূতি কখনো বদলায় না। দুর্গা পূজার সেই স্মৃতিগুলো ঠিক তেমনই—চিরন্তন, অমলিন। আজ আমি শুধু একটা কথাই বুঝি—জীবনের সবচেয়ে সুন্দর মুহূর্তগুলো আমরা তখনই পাই, যখন আমরা সেটা বুঝতে পারি না। আর পরে, যখন বুঝতে শিখি—তখন সেই মুহূর্তগুলো শুধু স্মৃতি হয়ে থাকে। তাই এখন যখন পূজা আসে, আমি আর শুধু উৎসব দেখি না—আমি আমার শৈশবকে খুঁজি। সেই ছোট ছোট আনন্দ, সেই নির্ভেজাল হাসি, সেই অপেক্ষা—সবকিছু খুঁজে ফিরি।
হয়তো আর কখনো সেই দিনগুলো ফিরে আসবে না।
কিন্তু সেই দিনগুলোর গল্প—সেগুলো চিরকাল আমার সঙ্গে থাকবে।
Last Update: 6 months ago
Casio Original Calculator
পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর
Leave a Reply