শৈশবের ঝগড়া ও বন্ধুত্ব এর হারিয়ে যাওয়া দিনগুলো

শৈশবের ঝগড়া ও বন্ধুত্ব এই দুইটি শব্দের মধ্যেই লুকিয়ে আছে আমাদের জীবনের সবচেয়ে নির্ভেজাল অনুভূতিগুলো। ছোটবেলায় বন্ধুদের সাথে খেলতে গিয়ে হঠাৎ করে ঝগড়া লেগে যাওয়া, আবার কিছুক্ষণ পরেই সব ভুলে গিয়ে একসাথে হাসতে শুরু করা—এই ঘটনাগুলোই ছিল আমাদের প্রতিদিনের গল্প। তখন কোনো অভিমান দীর্ঘস্থায়ী হতো না, কোনো রাগ মনে জায়গা করে নিতে পারত না। শৈশবের সেই ঝগড়াগুলো আসলে ছিল ভালোবাসারই এক অন্যরকম প্রকাশ, যা আজ বড় হয়ে এসে খুব বেশি অনুভব করা যায় না।

শৈশব মানেই ছিল একরাশ দুষ্টুমি, হাসি, কান্না আর ছোট ছোট যুদ্ধ। আমাদের পাড়ার সেই ছোট্ট মাঠটা ছিল যেন আমাদের রাজ্য—সেখানে প্রতিদিন বিকেলে আমরা জড়ো হতাম, কেউ ব্যাট-বল নিয়ে আসত, কেউ লাঠি দিয়ে গোলপোস্ট বানাত, আর কেউ শুধু গল্প করার জন্যই আসত। কিন্তু খেলাধুলা মানেই সবসময় শান্তি থাকত না। একটু পরেই শুরু হয়ে যেত ঝগড়া—“তুই আউট!”, “না, আমি আউট না!”, “বলটা আগে মাটিতে লেগেছে!”—এইসব নিয়ে তর্ক-বিতর্ক এমন পর্যায়ে পৌঁছাত যে কখনো কখনো হাতাহাতিও হয়ে যেত। তখন মনে হতো, এই বন্ধুত্ব বুঝি আর থাকল না। রাগে চোখ লাল হয়ে যেত, কথা বন্ধ হয়ে যেত, কেউ কেউ বাড়ি ফিরে যেত দরজা ধাক্কা মেরে।

কিন্তু আশ্চর্যের বিষয় ছিল, এই রাগ বেশিক্ষণ টিকত না। পরের দিনই আবার একই মাঠে, একই বন্ধুর সাথে হাসতে হাসতে খেলতে শুরু করতাম, যেন কিছুই হয়নি। সেই মারামারি, সেই ঝগড়াগুলো আসলে আমাদের সম্পর্ককে ভাঙেনি, বরং আরও শক্ত করেছিল। একদিন মনে আছে, আমার সবচেয়ে কাছের বন্ধু রাকিবের সাথে এমন ঝগড়া হয়েছিল যে আমরা দুজনেই কেঁদে ফেলেছিলাম। কারণটা ছিল খুব ছোট—একটা ব্যাট কে আগে ব্যবহার করবে! কিন্তু তখন সেই ছোট ব্যাপারটাই আমাদের কাছে বিশাল হয়ে গিয়েছিল। আমরা দুজনই একে অপরকে ধাক্কা দিয়েছিলাম, চিৎকার করেছিলাম, এমনকি কথা বন্ধ করে দিয়েছিলাম কয়েক ঘণ্টার জন্য।

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

সন্ধ্যার সময়, যখন আকাশটা ধীরে ধীরে অন্ধকার হয়ে আসছিল, তখন হঠাৎ রাকিব এসে আমার পাশে দাঁড়াল। কিছু না বলেই সে তার পকেট থেকে একটা চকলেট বের করে আমার হাতে দিল। আমি অবাক হয়ে তাকিয়ে ছিলাম, আর সে হেসে বলল, “রাগ করিস না, চল কাল আবার খেলব।” সেই মুহূর্তে বুঝেছিলাম, শৈশবের বন্ধুত্ব কতটা নির্ভেজাল আর নিঃস্বার্থ হয়। সেখানে অহংকার থাকে না, দীর্ঘদিনের দূরত্ব থাকে না—থাকে শুধু আবার একসাথে হাসার ইচ্ছে।

এখন যখন বড় হয়ে সেই দিনগুলোর কথা মনে পড়ে, তখন বুঝি—সেই মারামারি, সেই ঝগড়া, সেই অভিমানগুলোই ছিল আমাদের শৈশবের সবচেয়ে সুন্দর অংশ। কারণ সেগুলোর মধ্যেই লুকিয়ে ছিল ভালোবাসা, মায়া আর এক অদ্ভুত বন্ধন, যা আজকের দিনে খুঁজে পাওয়া খুব কঠিন। সেই ছোট্ট মাঠটা, সেই বিকেলের খেলাগুলো, আর সেই বন্ধুরা—সবকিছু যেন আজও মনে গেঁথে আছে, এক টুকরো অমূল্য স্মৃতির মতো।

শুধু ঝগড়া বা মারামারি নয়, আমাদের শৈশবের প্রতিটা দিনই যেন ছিল একেকটা গল্পে ভরা। কখনো আমরা দল বেঁধে “চোর-পুলিশ” খেলতাম, আবার কখনো “লুকোচুরি” খেলতে গিয়ে এমনভাবে লুকিয়ে থাকতাম যে খুঁজতে খুঁজতে সবাই ক্লান্ত হয়ে যেত। কিন্তু খেলার মাঝেই হঠাৎ করে শুরু হয়ে যেত নতুন ঝামেলা—কেউ বলত, “তুই ঠিকমতো খুঁজিস নাই!”, আবার কেউ অভিযোগ করত, “তুই নিয়ম মানিস নাই!”—এইসব নিয়ে তর্ক শুরু হয়ে একসময় এমন জায়গায় যেত যে দুজনের মধ্যে ঠেলাঠেলি, ধাক্কাধাক্কি হয়ে যেত। তখন মনে হতো, এই বন্ধুর সাথে আর কখনো কথা বলব না।

একবার এমনই একটা ঘটনা ঘটেছিল বর্ষাকালের এক বিকেলে। মাঠে কাদা জমে ছিল, তবুও আমরা খেলতে নেমে গিয়েছিলাম। সেদিন ফুটবল খেলতে গিয়ে বলটা নিয়ে এত বড় ঝগড়া হলো যে আমরা দুই দলে ভাগ হয়ে গেলাম। একসময় রাগের মাথায় আমি আমার বন্ধুকে এমন জোরে ধাক্কা দিয়েছিলাম যে সে কাদার মধ্যে পড়ে গিয়েছিল। সবাই হেসে উঠলেও, তার চোখে জল দেখে হঠাৎ করে আমার নিজেরই খারাপ লাগতে শুরু করল। তখন বুঝতে পারলাম, খেলার উত্তেজনায় আমরা কত সহজেই একে অপরকে আঘাত করে ফেলি, অথচ ভেতরে ভেতরে কেউই সেটা চায় না।

শৈশবের বন্ধুদের সাথে খেলাধুলা ও ঝগড়ার দৃশ্য
শৈশবের সেই দিনগুলো—ঝগড়া, মারামারি আর শেষে মিলনের হাসি

কিছুক্ষণ পরেই, সেই একই বন্ধুই কাদা মাখা মুখ নিয়ে হেসে বলল, “দেখ, তোর জন্য আমি পুরো কাদামানুষ হয়ে গেছি!”—তার সেই হাসিটা যেন সব রাগ মুছে দিল। আমরা আবার খেলায় ফিরে গেলাম, আবার হাসলাম, আবার একসাথে দৌড়ালাম। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন মনে হয়—এই ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আসলে জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ ছিল।

শুধু খেলার মাঠেই নয়, অনেক সময় বাড়ির সামনে, গলির মোড়েও আমাদের ছোট ছোট যুদ্ধ চলত। কখনো কারো নতুন খেলনা নিয়ে ঝগড়া, কখনো কারো সাইকেল আগে চালাবে সেটা নিয়ে তর্ক—এসব নিয়েই আমাদের দিন কেটে যেত। কিন্তু দিন শেষে যখন সবাই মিলে বসে গল্প করতাম বা আকাশের দিকে তাকিয়ে তারা গুনতাম, তখন সেই ঝগড়াগুলোর কোনো গুরুত্বই থাকত না। মনে হতো, বন্ধুত্বটাই আসল, বাকি সবকিছু তুচ্ছ।

এখন যখন আমরা বড় হয়ে গেছি, তখন সেই সরলতা আর নেই। এখন ঝগড়া হলে সেটা সহজে মেটে না, অনেক সময় দূরত্ব তৈরি হয়ে যায়। কিন্তু শৈশবের সেই দিনগুলোতে, একটা “sorry” বলারও দরকার হতো না—একটা হাসি, একটা ডাক, কিংবা একটা ছোট্ট চকলেটই সব ঠিক করে দিত। সেই সময়ের বন্ধুত্ব ছিল একদম নির্মল, যেখানে কোনো স্বার্থ ছিল না, ছিল শুধু একসাথে থাকার আনন্দ।

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে

আজও যদি চোখ বন্ধ করি, দেখতে পাই—সেই ছোট্ট মাঠ, সেই কাদা মাখা পা, সেই হাসি-খুশি মুখগুলো। মনে হয়, যদি আবার একবার সেই সময়ে ফিরে যেতে পারতাম! কারণ জীবনের সবচেয়ে বড় সুখগুলো আসলে লুকিয়ে ছিল সেই ছোট ছোট মারামারি, ঝগড়া আর মিলনের মাঝেই।

শৈশবের সেই দিনগুলোতে আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় সমস্যা ছিল—আজ কে জিতবে আর কে হারবে। কিন্তু সেই ছোট ছোট জয়ের লড়াইগুলোই কখন যে আমাদের মধ্যে এত আবেগ তৈরি করত, তা তখন বুঝিনি। একবার ক্রিকেট খেলতে গিয়ে আমি আউট হয়ে গিয়েছিলাম, কিন্তু কিছুতেই মানতে চাইছিলাম না। সবাই মিলে বলছিল, “তুই আউট!”, আর আমি জেদ ধরে বলছিলাম, “না, আমি নট আউট!”—এই নিয়ে এমন তর্ক শুরু হলো যে একসময় আমি ব্যাটটা মাটিতে ছুঁড়ে মেরে রাগে চলে যেতে লাগলাম। তখন মনে হচ্ছিল, কেউ আমাকে বুঝতে পারছে না, সবাই যেন আমার বিপক্ষে।

কিন্তু পেছন থেকে এক বন্ধু দৌড়ে এসে আমার হাত ধরে বলল, “আচ্ছা ঠিক আছে, তুই আবার খেল, আমরা কিছু বলব না।” তার সেই একটুকরো কথাই যেন আমার সব রাগ গলিয়ে দিল। আমি আবার ফিরে গেলাম, আবার খেলায় মিশে গেলাম। তখন বুঝিনি, কিন্তু এখন বুঝি—বন্ধুত্ব মানে কখনো কখনো নিজের ঠিক হওয়াটাকে প্রমাণ করা নয়, বরং সম্পর্কটা ধরে রাখাই সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ।

আরেকটা ঘটনা আজও খুব মনে পড়ে। একদিন আমরা সবাই মিলে গাছ থেকে আম পাড়তে গিয়েছিলাম। কে বেশি আম পাবে, সেটা নিয়েও শুরু হলো প্রতিযোগিতা। একজন বেশি আম পেয়ে গেলে অন্যরা রেগে যেত, আবার কেউ লুকিয়ে নিজের জন্য আম জমিয়ে রাখলে সেটাও নিয়ে ঝগড়া বাঁধত। সেদিন এমনই এক ঝগড়ার মধ্যে আমরা একে অপরকে দোষ দিতে দিতে প্রায় হাতাহাতির পর্যায়ে পৌঁছে গিয়েছিলাম। কিন্তু শেষ পর্যন্ত যখন সবাই মিলে সেই আমগুলো ভাগ করে খেতে বসেছিলাম, তখন মনে হয়েছিল—এই একসাথে খাওয়ার আনন্দটাই আসল, কে কতটা পেল সেটা কোনো ব্যাপারই না।

যাবতীয় ফাইল, ফর‌ম্যাট, সিভি ইত্যাদি পাবেন ডক ঘরে। বিস্তারিত জানতে ক্লিক করুন: https://docghor.com/

এই ছোট ছোট ঘটনাগুলো আমাদের অজান্তেই অনেক বড় শিক্ষা দিয়ে গেছে। শিখিয়েছিল, রাগ আসা স্বাভাবিক, কিন্তু সেই রাগ ধরে রাখা ঠিক না। শিখিয়েছিল, ভুল বোঝাবুঝি হতেই পারে, কিন্তু তা মিটিয়ে নেওয়াটাই আসল ব্যাপার। আর সবচেয়ে বড় কথা, শিখিয়েছিল—সত্যিকারের বন্ধুত্ব কখনো ছোট ছোট ঝগড়ায় ভেঙে যায় না।

আজ যখন চারপাশে তাকাই, তখন দেখি—মানুষ বড় হয়েছে, কিন্তু সেই সহজ সরল মনটা কোথায় যেন হারিয়ে গেছে। এখন আমরা অনেক হিসেব করি, অনেক কিছু ভেবে কথা বলি, কিন্তু শৈশবের মতো করে আর মন খুলে হাসতে পারি না। তখনকার সেই মারামারি, সেই ঝগড়া, সেই অভিমান—সবকিছু মিলেই ছিল এক অসাধারণ অনুভূতি, যা আজকের দিনে খুবই বিরল।

হয়তো আমরা আর কখনো সেই সময়ে ফিরে যেতে পারব না, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো আমাদের মনে চিরদিন বেঁচে থাকবে। যখনই জীবনের কোনো কঠিন মুহূর্ত আসে, তখন সেই শৈশবের দিনগুলোর কথা মনে পড়ে—মনে পড়ে, কিভাবে এত সহজে আমরা সব সমস্যা ভুলে যেতাম, আবার নতুন করে শুরু করতাম। তখন মনে হয়, জীবনের আসল সুখ আসলে খুব সাধারণ কিছু জিনিসেই লুকিয়ে থাকে—বন্ধুদের সাথে কাটানো কিছু নির্ভেজাল মুহূর্তে, কিছু ছোট ছোট ঝগড়ায়, আর তারপরে মিলনের সেই হাসিতে।

শৈশবের সেই বন্ধুত্বগুলো ছিল একদম কাঁচা মাটির মতো—সহজে গড়ে উঠত, আবার মুহূর্তেই ভেঙে যেত, কিন্তু আবার ঠিক তত দ্রুতই জোড়া লেগে যেত। একবার আমাদের পাড়ায় নতুন একটা ছেলে এসেছিল। প্রথমদিকে আমরা কেউ তাকে খেলায় নিতে চাইতাম না। কিন্তু একদিন খেলতে গিয়ে হঠাৎ তার সাথে বল নিয়ে ধাক্কাধাক্কি থেকে বড়সড় ঝগড়া লেগে গেল। আমরা সবাই মিলে তাকে দোষ দিচ্ছিলাম, আর সে একা দাঁড়িয়ে নিজের কথা বোঝানোর চেষ্টা করছিল। পরিস্থিতি এমন হয়েছিল যে, মনে হচ্ছিল সে আর কোনোদিন আমাদের সাথে খেলবে না।

কিন্তু পরের দিনই সে আবার মাঠে এলো, হাতে একটা নতুন বল নিয়ে। চুপচাপ এসে বলল, “আজকে আমরা সবাই মিলে খেলব, কেউ ঝগড়া করব না।” তার এই সহজ কথাটা যেন আমাদের ভেতরের সব কঠোরতা ভেঙে দিল। সেদিন থেকে সে-ই হয়ে উঠল আমাদের সবচেয়ে প্রিয় বন্ধুদের একজন। তখন বুঝেছিলাম—শৈশবের মন এতটাই সরল যে, সেখানে জায়গা করে নিতে খুব বেশি কিছু লাগে না, শুধু একটু আন্তরিকতাই যথেষ্ট।

আরেকদিনের কথা মনে পড়ে, আমরা সবাই মিলে “দৌড় প্রতিযোগিতা” করছিলাম। কে আগে ফিনিশ লাইনে পৌঁছাবে, সেটা নিয়েই ছিল উত্তেজনা। আমি খুব চেষ্টা করেও হেরে গেলাম, আর যে জিতেছিল, সে খুশিতে লাফাচ্ছিল। আমার রাগে তখন চোখে জল চলে এসেছিল। আমি তার সাথে কথা বলা বন্ধ করে দিলাম। কিন্তু কিছুক্ষণ পরেই সে নিজে থেকে এসে বলল, “চল, আবার দৌড়াই—এইবার তুই জিতবি।” তার সেই কথাটা শুনে মনে হয়েছিল, জেতার আনন্দের থেকেও কাউকে খুশি করার আনন্দ অনেক বড়।

এইসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই আমাদের ভেতরে অজান্তেই মানবিকতা তৈরি করেছিল। তখন আমরা বুঝতাম না “ইগো” কী, বুঝতাম না “দূরত্ব” কাকে বলে। আমরা শুধু জানতাম—বন্ধু মানে এমন কেউ, যার সাথে ঝগড়া করা যায়, আবার যার সাথে মিলে যাওয়াটাও খুব সহজ। সেই সম্পর্কগুলোতে কোনো জটিলতা ছিল না, কোনো অভিনয় ছিল না—ছিল শুধু সত্যিকারের অনুভূতি।

আজকের দিনে এসে মনে হয়, সেই মারামারি আর ঝগড়াগুলো আসলে খারাপ কিছু ছিল না। বরং সেগুলোই ছিল আমাদের অনুভূতির সবচেয়ে সৎ প্রকাশ। আমরা রাগ করতাম কারণ আমরা একে অপরকে গুরুত্ব দিতাম। আমরা কাঁদতাম কারণ বন্ধুকে হারানোর ভয় ছিল। আর আমরা আবার মিলে যেতাম কারণ বন্ধুত্বটা আমাদের কাছে সবচেয়ে বেশি মূল্যবান ছিল।

এখন যখন জীবনের নানা ব্যস্ততায় আমরা ডুবে থাকি, তখন সেই পুরনো দিনের কথা মনে পড়লে মনটা হালকা হয়ে যায়। মনে হয়, যদি আবার একবার সেই বিকেলগুলো ফিরে পেতাম—যেখানে কোনো দুশ্চিন্তা ছিল না, কোনো বড় সমস্যা ছিল না, ছিল শুধু বন্ধুদের সাথে কাটানো কিছু সোনালি মুহূর্ত। সেই মারামারি, সেই ঝগড়া, সেই হাসি-কান্না—সবকিছু মিলেই আমাদের শৈশবকে করে তুলেছিল এক অনন্য গল্প, যা সময়ের সাথে সাথে আরও বেশি মূল্যবান হয়ে উঠছে।

হয়তো সময় এগিয়ে যায়, মানুষ বদলে যায়, কিন্তু শৈশবের সেই বন্ধুত্ব আর সেই ছোট ছোট যুদ্ধগুলো চিরকাল হৃদয়ের এক কোণে থেকে যায়—নীরবে, কিন্তু গভীরভাবে। সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের মনে করিয়ে দেয়, জীবনের সবচেয়ে সুন্দর সময়গুলো আসলে খুব সাধারণ, খুব সহজ—আর সেগুলোই সবচেয়ে বেশি সত্যি।

সেই দিনগুলোর কথা মনে করলে একটা দৃশ্য সবসময় চোখের সামনে ভেসে ওঠে—আমাদের পাড়ার সেই পুরোনো মাঠটা ধীরে ধীরে ফাঁকা হয়ে যাচ্ছে। কেউ স্কুল বদলে অন্য জায়গায় চলে গেছে, কেউ পরিবারের সাথে অন্য শহরে, আবার কেউ পড়াশোনার চাপে আর খেলতে আসতে পারে না। একসময় যে মাঠটা আমাদের হাসি, ঝগড়া আর দৌড়ঝাঁপে ভরে থাকত, সেটাই যেন নিঃশব্দ হয়ে গেল। তখন বুঝতে পারলাম, শৈশব শুধু ধীরে ধীরে বড় হওয়া নয়—এটা একসময় নিঃশব্দে হারিয়েও যায়।

আরো পড়ুন:

সেদিন আমরা কয়েকজন শেষবারের মতো একসাথে হয়েছিলাম। কোনো বড় আয়োজন ছিল না, কোনো পরিকল্পনাও না—শুধু হঠাৎ করে সবাই এক জায়গায় জড়ো হয়েছিলাম। শুরুতে কেউ তেমন কথা বলছিল না, যেন সবাই নিজের নিজের স্মৃতিতে ডুবে ছিল। তারপর হঠাৎ করেই কেউ একটা পুরোনো কথা তুলে হাসতে শুরু করল—“মনে আছে, তুই একদিন ব্যাট নিয়ে পালিয়ে গিয়েছিলি?”—এই একটা কথাতেই সবাই হেসে উঠলাম। সেই হাসির মধ্যেই যেন ফিরে এল আমাদের সব পুরোনো দিন—সেই মারামারি, সেই ঝগড়া, সেই অভিমান আর সেই মিলন।

আমরা আবার একটু খেললাম, কিন্তু আগের মতো আর হলো না। শরীর বড় হয়ে গেছে, দায়িত্ব বেড়েছে, কিন্তু মনের ভেতরে সেই ছোট্ট শিশুটাই যেন লুকিয়ে ছিল। খেলার শেষে আমরা সবাই একসাথে বসে ছিলাম, কেউ কিছু বলছিল না। তখন আমাদের মধ্যে একজন ধীরে ধীরে বলল, “জানিস, আমরা হয়তো আর কোনোদিন এভাবে একসাথে হতে পারব না।” কথাটা শুনে কেউ কিছু বলল না, কিন্তু সবার চোখেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি ছিল—কিছুটা দুঃখ, আবার কিছুটা তৃপ্তি।

সন্ধ্যার আলোটা যখন আস্তে আস্তে মিলিয়ে যাচ্ছিল, আমরা একে একে বাড়ির দিকে হাঁটতে শুরু করলাম। বিদায়ের সময় কেউ “বিদায়” বলল না, কেউ “শেষ” বলল না—কারণ আমরা কেউই মেনে নিতে চাইছিলাম না যে, এই সময়টা সত্যিই শেষ হয়ে যাচ্ছে। কিন্তু মন জানত, এইটাই শেষ—এইভাবেই এক অধ্যায়ের পরিসমাপ্তি ঘটে।

আজ অনেক বছর পরে, যখন সেই মাঠের পাশ দিয়ে হেঁটে যাই, তখন দেখি নতুন কিছু বাচ্চা সেখানে খেলছে। তারা হয়তো এখন একইভাবে ঝগড়া করছে, মারামারি করছে, আবার কিছুক্ষণ পরেই মিলে যাচ্ছে। তখন মনে হয়, গল্পটা আসলে শেষ হয়নি—এটা শুধু আমাদের থেকে তাদের কাছে চলে গেছে।

আর আমাদের জন্য? আমাদের জন্য রয়ে গেছে সেই অমূল্য স্মৃতিগুলো—যেখানে আছে নির্ভেজাল বন্ধুত্ব, ছোট ছোট যুদ্ধ, আর ভালোবাসার নিঃশব্দ প্রকাশ। সেই স্মৃতিগুলোই আমাদের শেখায়, জীবনে যত বড়ই হয়ে যাই না কেন, ভেতরের সেই ছোট্ট শিশুটাকে যেন কখনো হারিয়ে না ফেলি।

কারণ শেষ পর্যন্ত, শৈশবের সেই মারামারি আর ঝগড়াগুলোই আমাদের সবচেয়ে সুন্দর বন্ধনের গল্প—একটা গল্প, যা শেষ হয় না, শুধু সময়ের সাথে সাথে স্মৃতিতে পরিণত হয়।


Last Update: 5 months ago

 

Casio Original Calculator

Casio Original Calculator

পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.