এন্টেনা ঘোরানো দিনগুলোর কথা — টেলিভিশনের জন্য অন্য বাড়িতে ছুটে চলা

মনে কি পরে সেই ছেলেবেলায় অন্য বাড়িতে গিয়ে টিভি দেখার কথা? আজ আলোচনা করতে চাচ্ছি সেই বিষয়ে। 

একটা সময় ছিল যখন “ঘরের ছেলে ঘরে বসে টিভি দেখে” কথাটা একেবারেই খাটত না। কারণ, সেই ঘরে টিভি-ই ছিল না। আর তাই টিভি দেখার জন্য আমাদের ছুটে যেতে হতো পাড়ার অন্য কোনো বাড়িতে। আধুনিক স্মার্ট টিভি, ইউটিউব বা ওটিটি প্ল্যাটফর্ম তখন ছিল কল্পনারও বাইরে। ছিল শুধু একটা বাক্স, যার নাম টেলিভিশন, আর তার মাথায় ছিল লম্বা দণ্ডাকৃতি এন্টেনা। সেই এন্টেনা ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে আমরা খুঁজতাম ‘ছবি’, যেটা আজকের ডিজিটাল প্রজন্ম বুঝবেই না।

আমার ছোটবেলা কেটেছে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলার মাইজপাড়া গ্রামে। আমার বাবা ফৌরদৌস ওয়াহিদ এর গ্রামের বাড়ির মসজিদের ইমাম ছিল। যেখানে পাড়ার একটি মাত্র বাড়িতে ছিল কালার টিভি। বাকি বাড়িগুলোতে হয়তো সাদা-কালো সেট, নয়তো কিছুই ছিল না। আমি ছিলাম দ্বিতীয় ক্যাটাগরির বাসিন্দা — আমাদের বাড়িতে কোনো টিভিই ছিল না। তাই বিকেল হলেই আমি ছুটে যেতাম সেই নির্দিষ্ট বাড়ির দিকে, যেখানে সন্ধ্যা নামলেই টিভির নিচু আওয়াজ ভেসে আসত।

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

সে বাড়ির সঙ্গে রক্তের সম্পর্ক না থাকলেও টিভির কারণে তৈরি হয়েছিল এক অদৃশ্য আত্মীয়তা। প্রতিদিন নিয়ম করে সেখানে গিয়ে বসা, খবর বা ধারাবাহিক দেখা, মাঝে মাঝে বিজ্ঞাপনের সময় পানি খাওয়া — এসব যেন জীবনের অঙ্গ হয়ে উঠেছিল। ব্যাটারি চালিত টিভি হওয়াতে অনেক সময় বিজ্ঞাপনের সময় বন্ধ রাখত। পরে চালু করলে দেখা যেত ছায়াছবির অনেক অংশ চলে গেছে!

আজকের দিনে যেখানে রিমোটের একটা বোতামে চ্যানেল বদলানো যায়, তখন সেটাও ছিল রীতিমতো এক যুদ্ধ। টিভির উপরের বা ছাদের এন্টেনা ঘুরিয়ে সঠিক ‘অ্যাঙ্গেল’ পাওয়া ছিল একটা চ্যালেঞ্জ। কেউ ছাদে দাঁড়িয়ে ‘ঘোরাও, ঘোরাও… এখন একটু থামো… উঁহু, একটু উল্টোদিকে ঘোরাও’ বলে নির্দেশ দিত, আর নিচে থাকা কেউ বলত, ‘হ্যাঁ, এখন ঠিক আছে!’

এই পুরো প্রক্রিয়াটায় একটা আনন্দ লুকিয়ে ছিল। টিভির ছবি স্পষ্ট হওয়া মানে একধরনের জয়। সাদা-কালো ঝিরঝিরে দৃশ্য থেকে হঠাৎ ঝকঝকে ছবি আসা, সেই উত্তেজনা ভাষায় বোঝানো যায় না। মাঝে মাঝে ছবি স্পষ্ট হলেও শব্দ আসত না, তখন আবার লাইন চেক করতে হতো। ছোট্ট আমিই তখন হয়ে উঠতাম মিনি টেকনিশিয়ান!

সব দিন যে আনন্দের ছিল, তা নয়। এমন অনেক দিন গেছে, যেদিন ভীষণ আগ্রহ নিয়ে কোনো বিশেষ অনুষ্ঠান দেখতে গেছি — হয়তো ‘শান্তিনিকেতন’, ‘মহাভারত’ বা ‘রঙিন ফিল্ম’ — আর সে বাড়ির লোক স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, “আজ আর হবে না, অন্য কাজ আছে।” কখনও হয়তো তারা বিরক্ত হয়ে টিভিটাই বন্ধ করে দিয়েছে, আর মুখ ঘুরিয়ে দিয়েছে।

এই ছোট্ট বাক্যটা তখন মনে হতো পৃথিবীর সবচেয়ে বড় অপমান। মনে হতো, আমি কি এতটাই অনাহূত? তারা কি শুধুই টিভি দেখার জন্য আমাকে সহ্য করে? এমন প্রশ্নে মনটা কেঁদে উঠত, কিন্তু মুখ ফুটে কিছু বলা হতো না। চুপচাপ হাঁটা ধরতাম নিজের বাড়ির দিকে। ফেরার সময় পেছনে তাকিয়ে দেখতাম, জানালার ফাঁক দিয়ে হয়তো সেই পরিবারই বসে টিভি দেখছে — আমায় বিদায় দিয়ে।

তবুও, টিভি দেখার সেই দিনগুলো আমাদের মাঝে এক ধরনের মিলন তৈরি করেছিল। পাড়ার অনেক ছেলেমেয়ে একসঙ্গে বসে কোনো একটা সিরিয়াল বা সিনেমা দেখতো। কেউ হাসত, কেউ ভয় পেত, কেউ কাঁদত। ঈদের দিন বা পূজোর বিশেষ অনুষ্ঠানের সময় পুরো ঘর ভর্তি থাকত মানুষে। একটা ছোট ঘরে গাদাগাদি করে বসে টিভি দেখার যে মজা ছিল, তা আজকের প্রাইভেট স্ক্রিনে নেই।

তখন ‘কমন’ অনুষ্ঠান ছিল কম, কিন্তু ‘কমন’ আনন্দ ছিল অফুরান। ‘গোরা’, ‘মহাভারত’, ‘জানোয়ার’ বা ‘চিত্রহার’ — এমন সব অনুষ্ঠান ছিল, যা নিয়ে পরের দিন স্কুলে আলোচনা হতো। কে কী দেখেছে, কোন অংশটা ভালো লেগেছে — এসব নিয়েই তৈরি হতো পাড়ার আলোচনার বিষয়।

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে

সময়ের সঙ্গে সঙ্গে আমরাও একদিন একটা ছোট সাদা-কালো টিভি কিনে ফেলি। নিজে থেকে চ্যানেল খোঁজা, নিজেই এন্টেনা ফিট করা, এই অভিজ্ঞতা যেন আমাকে স্বাধীনতার স্বাদ দিয়েছিল। তখন আর অন্য বাড়িতে যেতে হয়নি, আর কেউ আমাকে বলত না “আজ চলে যা”।

কিন্তু সেই প্রথম দিনগুলো, সেই টিভি দেখতে যাওয়ার জন্য বিকেল গোনার অপেক্ষা — সেগুলোর মূল্যই আলাদা। এখন নিজের ঘরে এলইডি টিভি আছে, ইউটিউব, নেটফ্লিক্স সবই আছে, তবু যেন ওই সাদা-কালো দিনের ছায়াগুলো মন থেকে মুছতে পারি না।

আজকের প্রজন্ম জন্ম থেকেই পেয়ে গেছে রিমোট, স্ক্রিন, চ্যানেল — তাই তাদের কাছে এই অভিজ্ঞতা গল্পের মতোই। তারা জানে না, একসময় টিভি ছিল প্রাপ্তি, আর এন্টেনা ঘোরানো ছিল এক রকম শিল্প। তারা জানে না, ‘আজ চলে যা’ কথাটার মধ্যে কতটা না পাওয়া লুকিয়ে থাকে।

স্মৃতি কখনও পুরনো হয় না, বরং সময়ের সঙ্গে আরও ঝকঝকে হয়। আজ যখন আকাশে লম্বা এন্টেনা দেখি না, তখন মন খুঁজে ফেরে সেই দিনগুলোকে। ছোটবেলায় অন্য বাড়িতে গিয়ে টিভি দেখা, নিজের চেয়ে টিভিকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া সেই অপমান, আর তার সঙ্গেই মিশে থাকা আনন্দ — সবকিছু মিলে গড়ে উঠেছিল এক স্বর্ণালি সময়। হয়তো আমরা এখন নিজের ঘরে বসে হাজার চ্যানেল দেখতে পারি, কিন্তু তখনকার একটা ছবির অপেক্ষায় যে উন্মাদনা ছিল, তা আজকের শত চ্যানেলেও পাওয়া যায় না।


Last Update: 8 months ago

 

Casio Original Calculator

Casio Original Calculator

পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর

About মহসিন উদ্দিন 30 Articles
মহসিন উদ্দিন একজন ব্লগার। ‍যিনি ২০১৩ সাল থেকে ব্লগিং করেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.