নব্বইয়ের দশক যেন আমাদের জীবনের এক সোনালি অধ্যায়। কোনো ব্যস্ততা ছিল না, না ছিল স্মার্টফোন, না ছিল সোশ্যাল মিডিয়ার যন্ত্রণা। সময় যেন নিজের গতিতে বয়ে চলত, ধীরে, শান্তভাবে। আমরা সকালবেলা ঘুম থেকে উঠে মাঠে ছুটতাম, বিকেলে স্কুল শেষে খেলাধুলা, আর সন্ধ্যা হলেই মা-বাবার ডাক: “চলে আয়, এবার পড়তে বস!”। জীবনটা যেন এক রঙিন রুটিনে বাঁধা ছিল, যার প্রতিটি পরতেই ছিল আনন্দ, কল্পনা, আর নির্মলতা। তখনকার জীবনটাকে এখনকার আধুনিক জীবনের সাথে মেলানো যায় না। টেলিভিশন ছিল ঘরের একমাত্র বিনোদনের উৎস। সকালে “মায়া মৃগয়া”, বিকেলে “দাদু-নাতি”, আর সন্ধ্যায় “জঙ্গলের রাজা” দেখার সময় ঘরে নিঃশব্দতা নেমে আসত। গরমে সবাই মিলে টিনের ছাদে উঠে শুয়ে থাকতাম, আকাশের তারা গুনে গুনে গল্প করতাম। এখনকার মতো প্রাইভেট গাড়ি ছিল না, কিন্তু সাইকেলের ঘণ্টার শব্দেই ছিল একধরনের রোমাঞ্চ। সবচেয়ে বড় কথা, তখন আমরা মানুষ ছিলাম কাছাকাছি। প্রতিবেশী মানে শুধু পাশের ফ্ল্যাট নয়, বরং দ্বিতীয় পরিবার। এক বাড়িতে কারেন্ট চলে গেলে অন্য বাড়ি থেকে বাতি জ্বলে উঠত। ঈদের সময় বাড়ির প্রতিটি দরজায় হাতের রান্না পাঠানো হতো। মোবাইল ছাড়াই যোগাযোগ হতো, কারণ মনগুলো ছিল সংযুক্ত।
নব্বইয়ের দশকে বড় হওয়া মানে একরাশ খেলার মাঠ, একঝাঁক বন্ধু আর সৃষ্টিশীল খেলার অভিজ্ঞতা। আমরা তখন মাঠে নামতাম গামছা বেঁধে, মাথায় রোদ্দুর, পায়ে খালি ধুলো। ক্রিকেট, গুটি, দাড়িয়াবান্ধা, কাবাডি – খেলার ছিল না কোনো সীমা। বৃষ্টির মধ্যে স্লিপ করে পড়া, আবার উঠে “এই যে, এখন আমি ব্যাটিং করব!” – এসব ছিল স্বাভাবিক। কিন্তু শুধু মাঠের খেলা নয়, আমাদের ছিল এক বিশাল কল্পনার জগৎ। সিগারেটের প্যাকেট বা দেয়াশলাইয়ের খালি বাক্স কেটে বানাতাম টাকা। কাগজ কেটে লেখা হতো ৫ টাকা, ১০ টাকা, ৫০ টাকা। যার কাছে বেশি টাকা, সে তখন আমাদের দলে বড়লোক, জমিদার। ছোট্ট চায়ের কাপ দিয়ে দোকান-পাটের খেলা, মাটির হাঁড়ি দিয়ে রান্না করা – এইসব ছিল আমাদের স্বপ্নের পৃথিবী। মাটির চারা দিয়ে খেলা হতো, কেউ হারলে মন খারাপ করত, আবার কেউ জিতলে মনে করত সে যেন অলিম্পিক জিতেছে। তখনকার খেলাগুলো শুধু শরীর নয়, মনের খোরাকও জোগাত। হার-জিতের হিসাব থাকলেও সম্পর্কের সমীকরণ কখনো বদলাত না। আমরা তখন পৃথিবীর সবচেয়ে কল্পনাবিলাসী মানুষ ছিলাম। কাঠের গাড়িতে চেপে দূরের শহর ঘুরে আসতাম, ভাবনায়। পেঁপে গাছের পাতায় রান্না করে পরিবেশন করতাম। পুতুলদের বিয়ে হতো, দাওয়াত দিয়ে খাওয়ানো হতো। আর সন্ধ্যায় বাড়ি ফিরে এসে সত্যিকার পড়ার বইয়ের মাঝে গুঁজে দিতাম ওইসব খেলার কাগজের টাকাগুলো—যেন সেগুলোই আমাদের আসল ধন।
নব্বইয়ের দশকে প্রযুক্তি মানেই ছিল টিভি আর ক্যাসেট প্লেয়ার। বড়জোর কেউ কেউ ছিল যারা ভিডিও ভিসিআর ভাড়া করে সিনেমা দেখত। সন্ধ্যায় বিটিভির নাটক দেখার জন্য সবাই টিভির সামনে বসে যেতাম। “এই সব দিনরাত্রি”, “বন্ধু”, “বহুব্রীহি”—এসব নাটক আমাদের জীবনবোধ গড়ে দিত। তখনকার বিনোদন ছিল পরিবারকেন্দ্রিক। রেডিও ছিল ঘুমানোর সময়ের সংগী। রাত ১০টার বাংলা গান, কিংবা বেলা ২টার সংবাদ—সব কিছুই ছিল নিয়মমাফিক। আমরা তখন গান শুনতাম মনের ভিতর, চোখ বন্ধ করে। একটা গান বারবার শুনেও বিরক্ত হতাম না, বরং তার কথা মুখস্থ হয়ে যেত। ক্যাসেট ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে গান শুনা, মাঝে মাঝে টেপে লাইন আটকে যাওয়া—এসব ছিল সেই সময়ের বাস্তবতা। কম্পিউটার তখন স্বপ্ন। যার বাড়িতে পেন্টিয়াম থ্রি কম্পিউটার ছিল, সে যেন কোনো ভিনগ্রহ থেকে এসেছে। Paint-এ ছবি আঁকা, Typing Tutor-এ টাইপ শেখা, আর মাঝে মাঝে ‘Mario’ গেম খেলা – এতেই কেটেছে অনেক বিকেল। স্মার্টফোন বা ইন্টারনেট ছিল না। কিন্তু ছিল গাছের ছায়া, সন্ধ্যার আলো, আড্ডার ভিড়। কোনো ছবি তুলতে হতো না, কারণ প্রতিটি মুহূর্ত হৃদয়ে গেঁথে রাখতাম। ছবি নয়, অনুভূতিই ছিল আমাদের মেমোরি কার্ড।
GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।
নব্বইয়ের দশকে স্কুল মানেই ছিল শুধু লেখাপড়া নয়, বরং এক আবেগের জায়গা। সকালবেলা ইউনিফর্ম পরে দৌড়ে যাওয়ার সেই হুড়োহুড়ি, পেছনের বেঞ্চে বসার যুদ্ধ, আর টিফিনের সময় ভাগাভাগি করে খাওয়া—এসব ছিল স্বর্ণালী সময়ের অংশ। প্রতিদিন স্কুলে যাওয়ার আনন্দ ছিল আলাদা। বোর্ডে স্যার বা ম্যাডামের লেখা নোট হুবহু খাতায় তুলে নেয়া, কালো হেডিং আর নিচে নীল কালি দিয়ে উপসংহার লেখা—এই নিয়ম মেনে চলতাম সবাই। কাগজের মোড়কে বই বাঁধা, রঙিন ছবির স্টিকার দিয়ে খাতার প্রথম পৃষ্ঠা সাজানো—এসবের মাঝেই ছিল পড়াশোনার রোমান্স। বন্ধুত্ব তখন ছিল নিখাদ। কাউকে কিছু দিতে না পারলে আমরা কষ্ট পেতাম, কেউ রাগ করলে “আর বন্ধু হবি না” বলে চোখে জল এনে ফেলতাম। জন্মদিনে একেকটা কলম উপহার পেলে সেটা জাদুর কাঠির মতো মনে হতো। আর কেউ যদি তার নতুন পেনসিল বক্স ব্যবহার করতে দিত—তবে সে ছিল “সত্যিকারের বন্ধু”। তখনকার প্রেম ছিল চোখে চোখে কথা বলা। কেউ যদি পাশের ক্লাসের কাউকে চিঠি দিত, পুরো ব্যাচ সেটা নিয়ে চুপচাপ উৎসাহী হয়ে উঠত। কিন্তু সবকিছু ছিল ভদ্রতা আর সীমার মধ্যে—শরম, ভয়, এবং কৌতূহলের এক মিশ্র অনুভব।
সময় থেমে থাকে না, নব্বইয়ের দশকও একদিন শেষ হয়ে গেছে। আজ আমরা ডিজিটাল দুনিয়ায় বাস করছি—হাতে মোবাইল, সামনে স্ক্রিন, কানে হেডফোন। কিন্তু এই সব কিছুর ভিড়ে কোথাও যেন সেই সরল জীবনের একটা অংশ হারিয়ে গেছে। আজকের শিশুরা আর কাগজ কেটে টাকা বানায় না, দেয়াশলাইয়ের বাক্স দিয়ে বাড়ি তৈরি করে না। তাদের খেলার সাথী একটি মোবাইল ফোন, যেটা বন্ধ হলে যেন জীবন থেমে যায়। আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে বড় হয়েছি, তারা জানি—আসল আনন্দ ছিল ওই সাদামাটা জীবনেই। ছোট ছোট জিনিসে খুশি হওয়া, অন্যের জন্য ভালোবাসা রাখা, একসাথে মিলে খেলার আনন্দ—এসবের কোনো বিকল্প নেই। নব্বইয়ের দশক শুধু একটি সময় নয়, এটা একধরনের অনুভব, যেটা আজও বুকের ভিতরে বাজে। এখনকার কোলাহলে ফিরে যেতে পারি না ঠিকই, কিন্তু চোখ বন্ধ করলেই শুনতে পাই সেই পুরোনো সাইকেলের ঘণ্টা, সেই মাটির চারা দিয়ে খেলার ধুলোমাখা আনন্দ, আর সেই সন্ধ্যার আলো—যেখানে “ভবিষ্যৎ” বলে কিছু ছিল না, ছিল কেবল “এখন”। আজও যখন পুরোনো দেয়াশলাইয়ের বাক্স দেখি, বা কোনো পুরোনো নাটকের দৃশ্য দেখি টিভিতে, মনে হয়—হয়তো সময়টা হারায়নি, কেবল একটু চুপচাপ হয়ে গেছে। স্মৃতির মধ্যে সে এখনো বেঁচে আছে, একেবারে জীবন্ত হয়ে।
নব্বইয়ের দশক ছিল হৃদয়ের এক অপরূপ সময়। আজ যারা এই লেখাটি পড়ছেন, তারা নিশ্চয়ই নিজের ভেতরেও কিছু স্মৃতি খুঁজে পাচ্ছেন। সেই দিনগুলো হয়তো ফিরবে না, কিন্তু আমরা পারি সেগুলোকে মনে রেখে একটু ধীরে হাঁটতে, একটু বেশি ভালোবাসতে—যেমনটা আমরা তখন করতাম।
Last Update: 8 months ago
Casio Original Calculator
পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর
Leave a Reply