রাত তখন প্রায় সাড়ে বারোটা। ছোট্ট সেই পুরোনো স্টেশনটা যেন সময়ের বাইরে পড়ে আছে—নিঃশব্দ, ফাঁকা, আর অদ্ভুতভাবে ভারী। বাতাসে এক ধরনের ঠান্ডা, কিন্তু সেটা সাধারণ ঠান্ডা না—মনে হয় যেন সেই ঠান্ডার ভেতরে লুকিয়ে আছে অদেখা কারও নিঃশ্বাস। প্ল্যাটফর্মের টিমটিম করে জ্বলা লাইটগুলো মাঝে মাঝে নিভে যেতে যেতে আবার জ্বলে উঠছে, যেন আলোও এখানে থাকতে ভয় পাচ্ছে। ছোটবেলায় শোনা ভূতের গল্প এর সাথে যেন এখন ঘটা ঘটনা গুলো মিলে যাচ্ছে। দূরে কোথাও কুকুর ডেকে উঠল, তারপর আবার সবকিছু নিস্তব্ধ। রাহাত দাঁড়িয়ে আছে একা, তার হাতে একটা পুরোনো ব্যাগ। বারবার সে ঘড়ির দিকে তাকাচ্ছে। শেষ ট্রেনটা অনেক আগেই আসার কথা ছিল, কিন্তু আজ যেন সবকিছু অদ্ভুতভাবে দেরি হচ্ছে। তবুও সে অপেক্ষা করছে—কারণ এই ট্রেনটাই তার বাড়ি ফেরার একমাত্র উপায়।
ঠিক তখনই, হঠাৎ করে দূরে রেললাইনের দিক থেকে একটা অস্বাভাবিক শব্দ ভেসে এলো। শব্দটা ট্রেনের মতো, কিন্তু তাতে একটা বিকৃত, ভাঙা সুর—যেন লোহার চাকা না, বরং কোনো কষ্ট পাওয়া প্রাণী ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে। রাহাতের বুকের ভেতরটা হালকা কেঁপে উঠল। সে তাকিয়ে রইল অন্ধকারের দিকে। ধীরে ধীরে অন্ধকার চিরে একটা ট্রেন বেরিয়ে এলো—পুরোনো, মরিচা ধরা, জানালাগুলো ভাঙা, আর ভেতরে কোনো আলো নেই। ট্রেনটা এসে থামল, কিন্তু কোনো শব্দ হলো না—না ব্রেকের, না মানুষের কোনো কোলাহল। যেন নিঃশব্দে এসে দাঁড়িয়ে পড়ল, আর অপেক্ষা করছে।
রাহাতের মনে সন্দেহ হলো, কিন্তু বাড়ি ফেরার তাড়া তাকে এগিয়ে যেতে বাধ্য করল। সে ধীরে ধীরে ট্রেনে উঠল। ভেতরে ঢুকতেই তার শরীরের ভেতর দিয়ে একটা বরফ শীতল বাতাস কেটে গেল। মনে হলো যেন সে জীবিতদের জগৎ থেকে অন্য কোথাও পা দিয়েছে। পুরো বগি ফাঁকা… শুধু এক কোণে একজন বসে আছে। মাথা নিচু, চুল এলোমেলো, মুখ দেখা যাচ্ছে না। রাহাত একটু থেমে গেল, তারপর দূরের একটা সিটে গিয়ে বসে পড়ল। ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল—কিন্তু অদ্ভুতভাবে কোনো শব্দ ছাড়াই।
GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

কিছুক্ষণ পর রাহাত বুঝতে পারল, কিছু একটা ঠিক নেই। সে জানালার বাইরে তাকাল—কিন্তু বাইরে কোনো স্টেশন নেই, কোনো আলো নেই, শুধু গভীর অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভেতরে মাঝে মাঝে যেন ছায়া নড়ছে, যেন কেউ দাঁড়িয়ে আছে, তাকিয়ে আছে। ঠিক তখনই সে অনুভব করল—কেউ তার দিকে তাকিয়ে আছে। সে ধীরে ধীরে ঘুরে তাকাল। সেই একমাত্র যাত্রীটা এখন তার দিকে মুখ তুলে তাকিয়ে আছে। তার চোখ… পুরো সাদা। কোনো মণি নেই। শুধু ফাঁকা, মৃত দৃষ্টি। রাহাতের গলা শুকিয়ে গেল। সে চোখ সরাতে চাইল, কিন্তু পারল না—মনে হলো সেই দৃষ্টি তাকে আটকে রেখেছে।
লোকটা ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়াল। তার পা মেঝেতে পড়ার শব্দও যেন শোনা যাচ্ছে না, তবুও প্রতিটা পদক্ষেপে বাতাস ভারী হয়ে উঠছে। সে ধীরে ধীরে রাহাতের দিকে এগিয়ে আসছে। রাহাত উঠে দাঁড়াতে চাইল, কিন্তু তার শরীর যেন পাথর হয়ে গেছে। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু তার গলা দিয়ে কোনো শব্দ বের হলো না। লোকটা তার একদম সামনে এসে থামল। তারপর খুব ধীরে, ফিসফিস করে বলল, “তুমি ভুল ট্রেনে উঠেছো…” তার কণ্ঠটা মানুষের মতো না—গভীর, ভাঙা, আর তার ভেতরে যেন একাধিক কণ্ঠ একসাথে কথা বলছে।
ঠিক তখনই ট্রেনের ভেতরটা বদলে যেতে শুরু করল। চারপাশে হঠাৎ করে অসংখ্য ছায়া দেখা গেল—সিটগুলোর মাঝে, জানালার পাশে, ছাদের কোণে। তারা সবাই দাঁড়িয়ে আছে, আর তাদের চোখও সাদা… সবাই রাহাতের দিকে তাকিয়ে আছে। রাহাতের বুকের ভেতরটা যেন থেমে যাচ্ছে। লোকটা আবার বলল, “এই ট্রেন… শুধু তাদের জন্য… যারা আর কখনো ফিরতে পারে না…” তার মুখটা ধীরে ধীরে বিকৃত হয়ে গেল, চোয়াল অস্বাভাবিকভাবে বড় হয়ে খুলে গেল, আর ভেতর থেকে এক লম্বা কালো জিভ বেরিয়ে এলো।
মজুমদার আই.টিতে অফলাইন কোর্সে ভর্তি চলছে। বিস্তারিত দেখুন: https://mojumderit.com/
হঠাৎ করে ট্রেনটা বিকটভাবে কেঁপে উঠল। রাহাতের চারপাশের ছায়াগুলো একসাথে তার দিকে ঝুঁকে এলো। সে অনুভব করল ঠান্ডা ঠান্ডা অসংখ্য হাত তার শরীর ছুঁয়ে যাচ্ছে, টেনে নিচ্ছে। তার চোখের সামনে সবকিছু ঝাপসা হয়ে গেল… আর তারপর—সব অন্ধকার।
পরের দিন সকালে স্টেশনের লোকজন শুধু একটা জিনিস খুঁজে পেল—প্ল্যাটফর্মের এক কোণে পড়ে থাকা রাহাতের ব্যাগ। মানুষটা নেই। কেউ তাকে দেখেনি, কেউ জানে না সে কোথায় গেল। সবাই ভাবল—হয়তো সে কোথাও চলে গেছে। কিন্তু বৃদ্ধ স্টেশন মাস্টার চুপচাপ বললেন, “আমি আগেই বলেছিলাম… রাত বারোটার পর এখানে কেউ থাকে না… কারণ তখন… সেই ট্রেন আসে…”
কিন্তু ঘটনার এখানেই শেষ না। কয়েকদিন পর, আরেকজন ছেলে—সোহেল—রাত করে বাড়ি ফিরছিল। সে একই স্টেশনে এল। উঠতেই তার মনে হলো—আজ সবকিছু অস্বাভাবিক। বাতাস ভারী, চারপাশে কোনো শব্দ নেই। হঠাৎ করেই প্ল্যাটফর্মের লাইটগুলো একসাথে নিভে গেল। পুরো জায়গাটা অন্ধকারে ডুবে গেল। আর সেই অন্ধকারের ভেতর সে শুনতে পেল—ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা সেই একই বিকৃত শব্দ।
তার সামনে আবার সেই ট্রেনটা এসে থামল। দরজাটা নিজে থেকেই খুলে গেল। ভেতরটা অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতরে কিছু নড়ছে। ঠিক তখনই সে শুনল—একটা কণ্ঠ তাকে ডাকছে, “এইদিকে এসো…” তার শরীর যেন নিজের ইচ্ছায় এগিয়ে যেতে লাগল। কিন্তু হঠাৎ করেই আরেকটা কণ্ঠ ফিসফিস করে বলল, “যেও না…” সোহেল থেমে গেল। তার বুক ধড়ফড় করছে। সে পেছনে ফিরতে চাইল।
LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light
এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে
ঠিক তখনই ট্রেনের ভেতর থেকে কয়েকটা বিকৃত ছায়া বেরিয়ে এলো। তারা হাত বাড়িয়ে তার দিকে এগিয়ে আসছে। তাদের চোখ সাদা… মুখ বিকৃত। সোহেল আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল, আর নিজের সব শক্তি দিয়ে দৌড় দিল। ঠিক তখনই দরজাটা বিকট শব্দে বন্ধ হয়ে গেল। ট্রেনটা আবার অন্ধকারের ভেতরে মিলিয়ে গেল। সোহেল বেঁচে গেল… কিন্তু পুরোপুরি না। সেই রাতের পর থেকে সে প্রায়ই একই স্বপ্ন দেখতে লাগল। সে দেখে—সে আবার সেই স্টেশনে দাঁড়িয়ে আছে… আর ট্রেনটা ধীরে ধীরে তার দিকে এগিয়ে আসছে। প্রতিবার ট্রেনটা আরও কাছে আসে। প্রতিবার ভেতরের ছায়াগুলো আরও স্পষ্ট হয়।
এক রাতে স্বপ্নের ভেতর সে দেখল—ট্রেনটা এসে তার সামনে থেমেছে। দরজাটা খুলেছে। আর ভেতর থেকে একজন বেরিয়ে আসছে। লোকটা কাছে আসতেই সে চিনতে পারল—এটা রাহাত। কিন্তু তার চোখ এখন সম্পূর্ণ সাদা। মুখে একটা ঠান্ডা, বিকৃত হাসি। সে ধীরে ধীরে সোহেলের সামনে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “এইবার… তোমার পালা…”
সোহেল চিৎকার করে ঘুম থেকে উঠল। তার শরীর ঘামে ভিজে গেছে। সে হাঁপাচ্ছে। চারপাশে তাকাল—সব ঠিক আছে। কিন্তু ঠিক তখনই… তার ঘরের দরজাটা ধীরে ধীরে কঁকিয়ে খুলে গেল। অন্ধকারের ভেতর থেকে ঠান্ডা বাতাস ঢুকল। আর সেই অন্ধকারের গভীর থেকে ভেসে এলো একটা পরিচিত কণ্ঠ—ভাঙা, ঠান্ডা, অমানবিক—
“চলো… ট্রেন চলে এসেছে…”
সোহেল প্রথমে ভেবেছিল—এটা হয়তো এখনও স্বপ্নেরই অংশ। কিন্তু তার বুকের ভেতর যে আতঙ্ক জমে উঠছে, সেটা কোনো স্বপ্নের মতো লাগছিল না। তার হাত-পা ঠান্ডা হয়ে আসছে, নিঃশ্বাস ভারী হয়ে যাচ্ছে। দরজাটা ধীরে ধীরে আরও খুলে গেল, আর ঘরের বাইরে করিডোরে একটুও আলো নেই—পুরো অন্ধকার। সেই অন্ধকারের ভেতর দাঁড়িয়ে আছে কেউ… না, কেউ না—কিছু একটা। তার কোনো স্পষ্ট অবয়ব নেই, শুধু দুটো ফ্যাকাশে সাদা চোখ অন্ধকার চিরে জ্বলজ্বল করছে। সোহেল বিছানার কোণায় সরে গেল। তার গলা শুকিয়ে গেছে। সে চিৎকার করতে চাইল, কিন্তু শব্দ যেন কোথাও আটকে গেল। সেই অন্ধকার থেকে আবার কণ্ঠটা ভেসে এলো—“তুমি তো ফিরে এসেছিলে… কিন্তু ট্রেন কাউকে ছেড়ে দেয় না…”

হঠাৎ করে ঘরের ভেতরের তাপমাত্রা একদম কমে গেল। দেয়ালের ঘড়িটার কাঁটা থেমে গেল ঠিক ১২টা ৩৩ মিনিটে। সোহেল বুঝতে পারল—এটা স্বাভাবিক কিছু না। তার মাথার ভেতর হঠাৎ করেই সেই রাতের দৃশ্যগুলো ঝলসে উঠতে লাগল—স্টেশন, অন্ধকার, ট্রেন, সাদা চোখ… আর সেই ফিসফিস করা কণ্ঠ। সে হঠাৎ করেই বিছানা থেকে লাফ দিয়ে উঠে দরজার দিকে দৌড় দিল। কিন্তু দরজার কাছে যেতেই সে থমকে গেল। কারণ দরজার বাইরে তার নিজের ঘরের করিডোর নেই—বরং সেখানে সেই একই পুরোনো স্টেশনের প্ল্যাটফর্ম।
টিমটিম করে জ্বলতে থাকা লাইট, ভাঙা বেঞ্চ, আর দূরে রেললাইন। সোহেলের বুকের ভেতরটা ধপ করে নেমে গেল। সে পেছনে ফিরে তাকাল—তার ঘরটা আর নেই। চারপাশে এখন শুধু সেই স্টেশন। সে বুঝতে পারল—সে আর বাস্তবে নেই, কিংবা বাস্তবটাই তার কাছ থেকে সরে গেছে। হঠাৎ করে সেই পরিচিত শব্দটা আবার ভেসে এলো—ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা ট্রেনের শব্দ। সোহেল কাঁপতে কাঁপতে রেললাইনের দিকে তাকাল।
অন্ধকারের ভেতর থেকে আবার সেই ট্রেনটা বেরিয়ে এলো। এবার আগের চেয়ে আরও ভাঙাচোরা, আরও বিকৃত। বগির গায়ে কালো দাগ, যেন পোড়া। জানালার ভেতর থেকে অসংখ্য সাদা চোখ একসাথে তাকিয়ে আছে। ট্রেনটা এসে থামল। দরজাটা খুলে গেল—এইবার কোনো শব্দ ছাড়াই। ভেতরটা আগের চেয়ে আরও অন্ধকার, কিন্তু সেই অন্ধকারের ভেতর থেকে অসংখ্য হাত নড়ছে… যেন অপেক্ষা করছে।
সোহেল দৌড়াতে চাইল। কিন্তু তার পা আবার আটকে গেল। যেন অদৃশ্য কিছু তাকে ধরে রেখেছে। হঠাৎ করেই সে অনুভব করল—তার পেছনে কেউ দাঁড়িয়ে আছে। ধীরে ধীরে সে ঘুরে তাকাল। আর তারপরই তার নিঃশ্বাস বন্ধ হয়ে আসল। তার পেছনে দাঁড়িয়ে আছে—রাহাত। কিন্তু সে আগের মতো না। তার শরীরটা বিকৃত, মুখটা ফেটে গেছে, চোখ দুটো পুরো সাদা, আর ঠোঁটের কোণে একটা অস্বাভাবিক হাসি।
রাহাত ধীরে ধীরে মাথা কাত করল, তারপর ফিসফিস করে বলল, “আমি তো বলেছিলাম… কেউ ফিরে আসে না… তুমি শুধু দেরি করেছো…” সোহেল কাঁপতে কাঁপতে বলল, “না… আমি যাব না…” তার কণ্ঠ কাঁপছিল, কিন্তু তার নিজের কাছেই সেটা খুব দুর্বল শোনাচ্ছিল। রাহাত হেসে উঠল—একটা ঠান্ডা, ফাঁপা হাসি, যা পুরো স্টেশনজুড়ে প্রতিধ্বনি হয়ে ছড়িয়ে পড়ল।
ঠিক তখনই ট্রেনের ভেতর থেকে অসংখ্য ছায়া একসাথে নড়ল। তারা ধীরে ধীরে বেরিয়ে আসতে লাগল। কেউ পুরো মানুষ না—কারো হাত লম্বা, কারো মুখ নেই, কারো শরীর অর্ধেক। তারা সবাই সোহেলের দিকে এগিয়ে আসছে। সোহেল চোখ বন্ধ করে চিৎকার করে উঠল। সে নিজের সব শক্তি দিয়ে পা নাড়াতে চেষ্টা করল… আর হঠাৎ করেই সে দৌড়াতে পারল।
সে পেছনে না তাকিয়ে দৌড়াতে লাগল। স্টেশন পেরিয়ে, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে, কোথাও… যেখানেই হোক। তার পেছনে সেই ছায়াগুলোর শব্দ, সেই বিকৃত হাসি, আর ট্রেনের হুইসেলের মতো ভয়ংকর আওয়াজ ভেসে আসছে। সে দৌড়াতে দৌড়াতে হঠাৎ করে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেল।
তারপর—সব চুপ।
সকালে লোকজন তাকে স্টেশনের বাইরে রাস্তায় পড়ে থাকতে দেখল। সে বেঁচে আছে… কিন্তু তার চোখে ভয় জমে আছে। সে কিছু বলতে পারছে না। শুধু মাঝে মাঝে একটাই কথা বলছে—“ওরা আসবে… আবার আসবে…”
কিন্তু আসল ভয়টা তখনও বাকি ছিল।
কারণ সেই দিন রাত বারোটার পর… স্টেশনের এক কোণে আবার দেখা গেল—একটা নতুন ব্যাগ পড়ে আছে। আর দূরে অন্ধকারের ভেতর দিয়ে সেই ট্রেনটা ধীরে ধীরে চলে যাচ্ছে… আর জানালার ভেতর থেকে এবার দুটো নয়… অসংখ্য সাদা চোখের মাঝে, নতুন করে আরেকটা মুখ দেখা যাচ্ছে—চোখে ভয় জমে থাকা… সোহেলের মুখ।
সোহেলকে যেদিন স্টেশনের বাইরে অচেতন অবস্থায় পাওয়া গেল, সেদিন থেকেই তার ভেতরে কিছু একটা বদলে গিয়েছিল। বাইরে থেকে সে বেঁচে আছে—শ্বাস নিচ্ছে, হাঁটছে, মাঝে মাঝে কথা বলছে—কিন্তু তার চোখে সেই আগের প্রাণ নেই। তার পরিবার প্রথমে ভেবেছিল, হয়তো ভয় পেয়ে এমন হয়েছে, সময় গেলে ঠিক হয়ে যাবে। কিন্তু সময় যাওয়ার সাথে সাথে তার আচরণ আরও অদ্ভুত হয়ে উঠতে লাগল। মাঝরাতে সে হঠাৎ উঠে বসে থাকে, অন্ধকারের দিকে তাকিয়ে থাকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা, যেন কারো সাথে চুপচাপ কথা বলছে। মাঝে মাঝে তার ঠোঁট নড়ে—কিন্তু কোনো শব্দ বের হয় না। আর সবচেয়ে ভয়ংকর ব্যাপার হলো, তার ঘরের ঘড়িটা প্রতিরাতে ঠিক ১২টা ৩৩ মিনিটে থেমে যায়।
একদিন তার ছোট বোন সাহস করে তাকে জিজ্ঞেস করেছিল, “তুই রাতে কার সাথে কথা বলিস?” সোহেল ধীরে ধীরে তার দিকে তাকিয়েছিল। সেই দৃষ্টি ছিল অদ্ভুত—গভীর, ফাঁকা, আর ঠান্ডা। তারপর সে খুব আস্তে করে বলেছিল, “ওরা আসে… ট্রেন থামে… সবাই নামে না… কিছুজন অপেক্ষা করে…” তার বোন আর কিছু জিজ্ঞেস করার সাহস পায়নি।
এরপর এক রাতে, ঠিক ১২টা ৩৩ মিনিটে, সোহেল হঠাৎ করে বিছানা থেকে উঠে দাঁড়াল। তার চোখ দুটো খোলা, কিন্তু দৃষ্টিতে কোনো অনুভূতি নেই। সে ধীরে ধীরে দরজার দিকে হাঁটতে লাগল। তার মা পাশের ঘর থেকে শব্দ শুনে ডাকলেন, “কোথায় যাচ্ছিস?” কিন্তু সোহেল কোনো উত্তর দিল না। সে দরজা খুলে বাইরে বেরিয়ে গেল। সেই মুহূর্তে তার মা যেন অদ্ভুত একটা ঠান্ডা বাতাস অনুভব করলেন—যেন দরজার বাইরে অন্য কোনো জগত দাঁড়িয়ে আছে।
সোহেল হাঁটতে হাঁটতে স্টেশনের দিকে চলে গেল। পুরো রাস্তা জুড়ে একটাও মানুষ নেই। বাতাস থেমে আছে, চারপাশে নিস্তব্ধতা। সে প্ল্যাটফর্মে গিয়ে দাঁড়াল—ঠিক সেই জায়গায়, যেখানে প্রথম রাতে সে ট্রেনটা দেখেছিল। কয়েক সেকেন্ড সব চুপচাপ… তারপর দূরে সেই পরিচিত শব্দ—ধীরে ধীরে এগিয়ে আসা বিকৃত ট্রেন।
এইবার ট্রেনটা আগের চেয়েও ভয়ংকর। বগির গায়ে পোড়া দাগ, ভাঙা জানালার ভেতর থেকে অসংখ্য সাদা চোখ একসাথে তাকিয়ে আছে। ট্রেনটা এসে থামল। দরজাটা খুলে গেল। আর ভেতর থেকে ধীরে ধীরে কয়েকটা ছায়া বেরিয়ে এলো। তাদের মধ্যে একজন সামনে এগিয়ে এলো—রাহাত।
কিন্তু এইবার তার চেহারায় একটা অদ্ভুত শান্তি। সে সোহেলের সামনে এসে দাঁড়াল, তারপর বলল, “এবার তুমি পুরোপুরি আমাদের…” সোহেল কোনো প্রতিরোধ করল না। সে ধীরে ধীরে মাথা নাড়ল। যেন সে আগেই সব মেনে নিয়েছে। ছায়াগুলো তাকে ঘিরে ধরল। ঠান্ডা হাতগুলো তার শরীর ছুঁয়ে গেল। তারপর ধীরে ধীরে তাকে ট্রেনের ভেতরে টেনে নেওয়া হলো।
আরো পড়ুন:
দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল।
ট্রেনটা আবার চলতে শুরু করল।
কিন্তু আসল রহস্যটা তখনো বাকি ছিল।
পরদিন সকালে, স্টেশনের সেই বৃদ্ধ মাস্টার একা বসে ছিলেন। তিনি জানালার বাইরে তাকিয়ে ছিলেন, যেন কিছু ভাবছেন। হঠাৎ করে তার টেবিলের ওপর রাখা পুরোনো একটা ফাইল খুলে গেল বাতাসে। ভেতর থেকে একটা হলুদ হয়ে যাওয়া কাগজ বেরিয়ে এলো। সেটা ছিল বহু বছর আগের এক ট্রেন দুর্ঘটনার রিপোর্ট।
সেই রিপোর্টে যাত্রীদের নামের তালিকা ছিল।
বৃদ্ধ ধীরে ধীরে তালিকাটা পড়তে লাগলেন… আর হঠাৎ করেই তার চোখ থেমে গেল।
কারণ তালিকার একদম নিচে লেখা ছিল—
“সোহেল ইসলাম”
তারিখটা… আজ থেকে প্রায় ১৫ বছর আগের।
বৃদ্ধের হাত কেঁপে উঠল। তার নিঃশ্বাস ভারী হয়ে গেল। তিনি ফিসফিস করে বললেন, “তাহলে… সে তো আগেই… মারা গেছে…”
হঠাৎ করেই স্টেশনের বাইরে থেকে সেই ট্রেনের হুইসেলের শব্দ ভেসে এলো। বৃদ্ধ ধীরে ধীরে জানালার দিকে তাকালেন। দূরে, অন্ধকারের ভেতর দিয়ে ট্রেনটা আবার যাচ্ছে। আর জানালার ভেতর… অসংখ্য সাদা চোখের মাঝে, নতুন আরেকটা মুখ স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে—
একটা ছোট ছেলের মুখ…
ভয়ে জমে যাওয়া চোখ…
যেন সে সাহায্য চাইছে…
বৃদ্ধ হঠাৎ করে বুঝতে পারলেন—
এই ট্রেন শুধু মৃতদের জন্য না…
এটা জীবিতদেরও টেনে নেয়…
আর একবার কেউ এর সাথে জড়িয়ে গেলে…
সময়, মৃত্যু, বাস্তব—কিছুই আর আলাদা থাকে না।
সেই দিন থেকে স্টেশনটা একদম পরিত্যক্ত হয়ে যায়। কেউ আর সেখানে যায় না। লোকজন বলে—গভীর রাতে, যদি কেউ ভুল করে ওই স্টেশনের পাশ দিয়ে যায়, তাহলে সে দূরে একটা ট্রেন দেখতে পায়… ধীরে ধীরে এগিয়ে আসছে… আর তার ভেতর থেকে অসংখ্য চোখ তাকিয়ে থাকে।
Last Update: 6 months ago
Casio Original Calculator
পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর
Leave a Reply