ফিরে দেখা সেই বিকেল: ৯০-এর দশকে ছেলেবেলা

সময়টা তখন নব্বইয়ের দশক। আমাদের শৈশব ছিল এক রঙিন গ্রাফিক্সে আঁকা অ্যালবামের মতো, যেখানে প্রতিটি ছবি যেন জীবন্ত হয়ে ভেসে ওঠে মনের পর্দায়। আজকের দিনে দাঁড়িয়ে যদি পিছনে তাকাই, চোখের সামনে ভেসে ওঠে সেই বিকেলগুলো, যেখানে সূর্য ডোবার আগেই একটা ছুটে চলা শুরু হতো—পায়ের গতি আর হাওয়ার শব্দ এক হয়ে যেত। প্রাইমারী স্কুল থেকে ফিরে ছাতার মতো ব্যাগ ছুঁড়ে ফেলে আমরা ঝাঁপিয়ে পড়তাম বিকেলের রাজত্বে। তখন সময় বুঝি এমনিই ধীরে চলত, আর আমাদের জীবনের ছন্দ তৈরি হতো দৌড়, হাসি, মাটির গন্ধ আর আনন্দে ভেজা ঘামে।

আমার ছেলেবেলা কেটেছে মুন্সিগঞ্জের শ্রীনগর উপজেলায়। পড়তাম ৭৯ নং দক্ষিন মাইজপাড়া সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ে। মোস্তফা স্যার ছিল প্রধান শিক্ষক, আপা ম্যাডাম, লোকনাথ স্যার (সেকেন্ড স্যার), আমান স্যার ওনারা ছিল খুবই বন্ধুসুলভ। আমাদের স্কুল তখন কেবলই একটি ভবন নয়, ছিল একটা আলাদা জগৎ। টিফিনের সময় আচার কিংবা ১ টাকায় ৪টি চকলেট খাওয়ার জন্য সবার আগে দৌড়ে গিয়ে লাইনে দাঁড়ানোর প্রতিযোগিতা, স্যারের বেতের বাড়ি খেয়ে চোখের জল লুকিয়ে হাসার চেষ্টা, আর ছুটির ঘণ্টা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই বই খাতার বোঝা ভুলে একটানা ছুটে চলা ছিল আমাদের দৈনন্দিন নাটকের অংশ। সেই সময়কার শিক্ষা যেন কেবল বইয়ের পাতায় সীমাবদ্ধ ছিল না, প্রতিটি শাসনের মধ্যেও লুকিয়ে ছিল যত্ন, প্রতিটি শাস্তির মধ্যেও ছিল একটা অলিখিত ভালোবাসা।

আমাদের বিকেলগুলো আসলে শুরু হতো স্কুল ছুটি থেকেই। কেউ বাসায় ফিরেই ছাদে উঠে যেত, কেউ মাঠে দৌড়ে যেত সোজা। কারও হাতে ফুটবল, কারও কাছে মার্বেল, আবার কেউ দড়ি লাফ খেলায় মেতে উঠত। তখন আমরা ঘড়ি দেখতাম না, সূর্যের আলো ম্লান হলে তবেই বুঝতাম ‘ফিরে যাবার সময় হয়েছে’। বাড়ির জানালা থেকে মায়ের ডাক ভেসে আসত—“এই যা, অন্ধকার হয়ে গেছে!”—সেই ডাক শুনেই আমাদের মন খারাপ হয়ে যেত, কারণ সন্ধ্যার আলো মানেই খেলার শেষ।

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

প্রত্যেক এলাকায় একেকজন ‘অফিশিয়াল আচারওয়ালা’ থাকত, যার কাছে মাত্র এক টাকা, দুই টাকা দিলেই মেলে স্বর্গীয় স্বাদের টক-মিষ্টি ঝাল আচার। স্কুল থেকে ফেরার পথে দাঁড়িয়ে থেকে সেই আচারের গন্ধে মোহিত হয়ে যেতাম। লাল করে রঙিন করা তেঁতুল কিংবা আমসত্ত্ব যেন আমাদের অলিখিত শিশুকাব্য ছিল। আইসক্রিমও ছিল তখনকার অন্যতম প্রিয় সম্পদ। সেই গোল্ডেন কাপে ভরা, উপরে চকলেট লেপা আইসক্রিম পাওয়া যেত দেড় টাকা বা দুই টাকায়। এত স্বাদ হয়ত আজকের দামি ডেজার্টেও খুঁজে পাওয়া যায় না।

স্কুলব্যাগে লুকিয়ে রাখা ক্রিকেট বল ছিল তখনকার অন্যতম গুপ্তধন। দুপুরের খাওয়া শেষে মাঠে দৌড়ে গিয়ে আমরা নিজেরা ভাগ হয়ে যেতাম দুই দলে। বোলিংয়ের আগে বলটাকে ঘষে ঘষে চকচকে করতাম, যেন পেস বেড়ে যায়। খেলায় হেরে গেলে মান অভিমান হতো, পরদিন আবার সেই বন্ধুদের সাথেই কাঁধে হাত রেখে মাঠে যেতাম। কারও হাতে হ্যান্ড সাউন্ড বক্স ছিল না, কেউ হেডফোন দিয়ে গানের দুনিয়ায় হারিয়ে যেত না—আমরা গান গাইতাম মুখে মুখেই। হয়ত কেউ ‘চাঁদের হাসি বউ’ গাইছে, কেউ গাইছে ‘চাঁদনী রাতে তোমার সঙ্গে’, আর সেসব গানের মধ্যে দিয়েই আমাদের কৈশোর এগিয়ে যেত।

বিকেলের পর বাড়ি ফিরে গোসল সেরে মায়ের বানানো মুড়ি, চিড়া বা ডালের বড়া খেয়ে ঘরে বসা। তখন টিভি মানেই ‘বিলুপ্ত প্রজাতি’—তবে যার বাড়িতে ছিল, সে ছিল পাড়ার হিরো। একসঙ্গে ১০–১২ জন মিলে বসে দেখতাম ‘দোয়েল’, ‘নকশিকাঁথা’, বা ‘মিঠুনের সিনেমা’। মাঝেমাঝে ব্ল্যাকআউট হলে সবাই মোমবাতি জ্বালিয়ে গল্প করত, ভূতের কাহিনি বলত, কেউ ভয়ে কাঁপত, কেউ আবার সাহস দেখিয়ে টয়লেটে যেত একা।

একটা সময় ছিল যখন আমরা চিঠি লিখতাম। কারও জন্মদিনে হাতে আঁকা কার্ড বানিয়ে চিঠি লিখে দিতাম। তাতে হয়ত বানান ভুল থাকত, কিন্তু আবেগে ঘাটতি থাকত না। কখনো স্কুল ডায়েরির শেষ পাতায় আঁকিবুকি করে প্রিয় বন্ধুকে কিছু লিখে দিতাম, আর সে সেটা যত্ন করে রেখে দিত দিনের পর দিন।

সেই সময় মোবাইল ছিল না, কিন্তু যোগাযোগে ঘাটতি ছিল না। মুখে মুখে খবর ছড়াত, “আজ বিকেলে নতুন লাট্টু এনেছে রনি, মাঠে সবাই যাবে”—এই ছোট্ট বাক্যেই ছেলেবেলার সোশ্যাল মিডিয়া সম্পন্ন হয়ে যেত। যাদের বড় ভাই বা বোন ছিল, তারা গল্পের ধারা নিয়ে আসত, আমরা সেই গল্পকে সাজিয়ে নাটক বানিয়ে খেলতাম। মাঝে মাঝে পাড়ার স্কুলে বা ক্লাবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান হতো, যেখানে সবাই নাচ-গান-আবৃত্তিতে অংশ নিত। প্রস্তুতি নিতে গিয়ে সন্ধ্যা পেরিয়ে রাত হয়ে যেত, কিন্তু ক্লান্তি আসত না।

নব্বইয়ের দশকে জন্মানো ছেলেমেয়েরা মূলত বড় হয়েছে অপেক্ষা আর কল্পনার মধ্যে দিয়ে। নতুন খেলনা আসবে—এই আশায় প্রতিদিন দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে থাকা, ঈদের জন্য জামা কিনতে গিয়ে এক সপ্তাহ আগে থেকেই সেটার গন্ধ শুঁকে রাখা, বা বইমেলায় যাওয়ার পরিকল্পনা করে রাত জেগে ভাবনার জগতে ডুবে থাকা—এসবই ছিল আমাদের বাস্তবতা। তখনকার আনন্দ খুব সহজ ছিল, বিনিময়ে কিছুর প্রয়োজন হতো না।

তখন ইন্টারনেট ছিল না, কিন্তু আমাদের মস্তিষ্কের ডেটাবেইজ ছিল ভরপুর। বন্ধুর নাম, তার বাবা কী করেন, কে কোন পিঠা খায়, কে কত জোরে দৌড়াতে পারে—সব ছিল মুখস্ত। আজ আমরা গুগলে সার্চ করি, তখন আমরা মাটিতে হাত রেখে বলতাম, “এইটা আমি জানি!”—আর সেটাই ছিল আমাদের সার্চ ইঞ্জিন।

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে

আজকের দিনে দাঁড়িয়ে আমরা অনেকেই হয়তো স্মার্টফোনে নিমগ্ন, কনটেন্ট স্ক্রল করে দিন পার করছি। কিন্তু কখনো কি মনে পড়ে সেই গাছতলায় বসে বানানো বালির চা, সাইকেলের পেছনে চড়ে ঘোরার সেই স্বাদ? কখনো কি কানে বাজে সেই বিকেলের ডাকে ভেসে আসা ‘চলো খেতে’ আওয়াজ?

সেই সোনালি বিকেলগুলো এখন আর ফিরে আসে না ঠিকই, কিন্তু মনে পড়ে গেলেই একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়—যেন পুরোনো অ্যালবাম খুলে পড়ছি, ছবি না দেখে শুধু গন্ধ শুঁকে বুঝে নিচ্ছি—‘এইটা সেই দিন’।

আমরা যারা নব্বইয়ের দশকে জন্মেছি, আমাদের শৈশবের সেই বিকেল কেবলই একটি সময় নয়, এটি এক অনুভব। আজ যখন আমাদের সন্তানেরা ডিজিটাল খেলায় ব্যস্ত, তখন আমরা চোখ বন্ধ করে যদি একবার ভাবি, তখনকার একটা বিকেল যেমন হতো—হয়তো চোখের কোণে একটু জল জমে যাবে।

শৈশবের সেই বিকেলগুলো আমাদের গড়ে তুলেছে। সেটাই আমাদের করে তুলেছে মানবিক, কল্পনাশীল এবং স্মৃতিকাতর। সময়ের চাপে সেসব হয়তো পেছনে পড়ে গেছে, কিন্তু মনের ভেতরে এখনো একটা ছোট্ট মাঠ আছে, যেখানে আমরা প্রতিদিন দৌড়াই, পড়ে যাই, উঠে দাঁড়াই, আবার হেসে ফেলি।


Last Update: 6 months ago

 

Casio Original Calculator

Casio Original Calculator

পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর

About মহসিন উদ্দিন 30 Articles
মহসিন উদ্দিন একজন ব্লগার। ‍যিনি ২০১৩ সাল থেকে ব্লগিং করেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.