একটি দোকান আর সুযোগসন্ধানী এক লোকের গল্প

আমাদের বাজারের এক কোণায় ছিল ছোট্ট একটি সাইবার ক্যাফে। দোকানের নাম বেশ আধুনিক—“ডিজিটাল পয়েন্ট”। কিন্তু ভেতরের চিত্র ছিল খুবই সাদামাটা। দুইটা কম্পিউটার, একটা প্রিন্টার, একটা স্ক্যানার, সামনে কাঠের টেবিল আর কয়েকটা প্লাস্টিকের চেয়ার। এই দোকানটাই চালাতেন জামশেদ। মানুষটা খুব শান্ত স্বভাবের, বিনয়ী এবং একটু বেশিই ভালো বলা যায়। কেউ অনলাইনে ফরম পূরণ করতে আসে, কেউ জন্মনিবন্ধন, কেউ জমির খতিয়ান, আবার কেউ চাকরির আবেদন—সব কাজ জামশেদ ধৈর্য ধরে করে দিতেন। বাজারে ধীরে ধীরে তার একটা ভালো নামও হয়ে গিয়েছিল। লোকজন বলত, “জামশেদের দোকানে গেলে কাজটা ঠিকঠাক হয়।”

একদিন দুপুরবেলা দোকানে ঢুকল একজন নতুন লোক। গায়ে একটু ঝকঝকে শার্ট, হাতে একটা ফাইল, মুখে আত্মবিশ্বাসী ভাব। ঢুকেই বলল, “ভাই, একটু বসতে দেবেন? বাইরে তো দাঁড়ানো যাচ্ছে না।” জামশেদ তো এমনিতেই ভালো মানুষ। হাসিমুখে বললেন, “বসেন বসেন, সমস্যা নাই।” লোকটার নাম ছিল মাসুদ। পরে জানা গেল সে জমির দালালি করে। প্রথম দিন সে শুধু বসেই ছিল। মাঝে মাঝে ফোনে কথা বলছিল—“হ্যালো ভাই, ওই তিন কাঠার প্লটটা কিন্তু ভালো… একটু দাম কমলে আমাকে বলেন।” জামশেদ তখন তেমন গুরুত্ব দেননি। মনে করেছিলেন লোকটা একটু বসে বিশ্রাম নেবে, তারপর চলে যাবে।

কিন্তু সেই বসা যেন শেষই হলো না। পরদিন আবার এল মাসুদ। ঢুকেই বলল, “ভাই, একটু বসি?” জামশেদ আবারও বললেন, “বসেন।” এরপর থেকে প্রায় প্রতিদিনই মাসুদ এসে দোকানের এক কোণে চেয়ার দখল করে বসে থাকত। সকাল থেকে বিকেল পর্যন্ত ফোনে জমির গল্প, ফাইল ঘাঁটা আর লোকজনকে ফোন করা—এসবই চলত। প্রথম দিকে জামশেদ ভেবেছিলেন এতে সমস্যা নেই। দোকানে লোকজন থাকলে হয়তো পরিবেশটা জমজমাট দেখাবে।

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W

উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।

কিন্তু কয়েকদিন পরেই জামশেদ বুঝতে শুরু করলেন, ব্যাপারটা ধীরে ধীরে অন্যদিকে যাচ্ছে। একদিন একজন কাস্টমার দোকানে এসে বলল, “ভাই, জমির খতিয়ানটা একটু অনলাইনে বের করে দেবেন?” জামশেদ কম্পিউটার চালু করতে যাচ্ছেন, এমন সময় পাশ থেকে মাসুদ বলে উঠল, “খতিয়ান লাগবে? আমার কাছে সব তথ্য আছে। আমি দেখিয়ে দিচ্ছি।” তারপর লোকটাকে নিয়ে দোকানের বাইরে গিয়ে আধা ঘণ্টা কথা বলল। পরে লোকটা ফিরে এসে শুধু বলল, “ঠিক আছে ভাই, পরে আসব।” জামশেদ তখন একটু অবাক হলেও পুরো ব্যাপারটা বুঝতে পারেননি।

দিন যত যেতে লাগল, মাসুদের সাহস তত বাড়তে লাগল। দোকানের একটা চেয়ার যেন তার ব্যক্তিগত অফিস হয়ে গেল। সকাল দশটায় এসে বসে, বিকেল পর্যন্ত ফোনে জমির ডিল। মাঝে মাঝে দোকানের প্রিন্টার ব্যবহার করত, স্ক্যান করত, ফটোকপি করত। আর টাকা দেওয়ার সময় বলত, “ভাই, পরে দিচ্ছি।” সেই “পরে” আর আসত না। সবচেয়ে মজার ব্যাপার হলো—মাসুদ মাঝে মাঝে দোকানের সামনে দাঁড়িয়ে লোকজনকে হাত নেড়ে ডাকত, যেন দোকানটা তার নিজের।

একদিন তো এমন ঘটনা ঘটল যে জামশেদ নিজেই অবাক হয়ে গেলেন। একজন লোক দোকানে এসে বলল, “ভাই, একটা জমি দেখতে চাইছিলাম…” জামশেদ কিছু বলার আগেই মাসুদ চেয়ার থেকে উঠে দাঁড়িয়ে বলল, “চলুন চলুন, আমি দেখাচ্ছি।” তারপর দুজন দোকান থেকে বের হয়ে গেল। জামশেদ তখন মনে মনে ভাবলেন—“এটা কি আমার দোকান, নাকি মাসুদের অফিস?”

বাজারের লোকজনও বিষয়টা নিয়ে মজা করতে শুরু করল। একজন একদিন হেসে বলল, “জামশেদ ভাই, আপনার দোকানে বসে মাসুদ ভাই তো পুরো জমির অফিস খুলে ফেলেছে!” জামশেদ তখন হাসলেন ঠিকই, কিন্তু ভেতরে ভেতরে তার মন খারাপ হয়ে গেল। কারণ তিনি বুঝতে পারছিলেন—তার দোকান, তার বিদ্যুৎ, তার ইন্টারনেট—সব ব্যবহার করে অন্য একজন দিব্যি টাকা কামাচ্ছে।

এর মধ্যে মাসুদ আবার নতুন কৌশল শুরু করল। কেউ দোকানে কোনো জমির কাগজ নিয়ে এলে সে আগে থেকেই কথা বলে ফেলত। কখনো বলত, “চাচা, জমিটা বিক্রি করবেন?” আবার কখনো বলত, “এই জায়গাটার দাম বাড়বে।” একদিন এক বৃদ্ধ লোক দোকানে এসেছিলেন শুধু জমির কাগজ স্ক্যান করতে। জামশেদ স্ক্যানার চালু করছেন, এমন সময় মাসুদ আবার কথায় ঢুকে পড়ল। “চাচা, যদি জমিটা বিক্রি করেন, আমাকে বলেন।” বৃদ্ধ লোকটা অবাক হলেও হাসলেন। দুইদিন পরে বাজারে খবর ছড়িয়ে পড়ল—মাসুদ সেই জমির দালালি করে মোটা কমিশন নিয়েছে।

জামশেদ তখন বুঝলেন—এই অবস্থা চলতে থাকলে একসময় তার নিজের দোকানটাই অন্যের অফিস হয়ে যাবে। তিনি হিসাব করে দেখলেন—বিদ্যুৎ বিল, ইন্টারনেট বিল, দোকান ভাড়া—সবই তিনি দিচ্ছেন। আর মাসুদ দিব্যি বসে বসে হাজার হাজার টাকা কামাচ্ছে। অথচ প্রিন্টার ব্যবহার করলেও ঠিকমতো টাকা দেয় না।

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light

এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে

একদিন বিকেলে মাসুদ আবার বলল, “ভাই, প্রিন্টারটা একটু ব্যবহার করি?” জামশেদ বললেন, “করেন।” কয়েকটা কাগজ প্রিন্ট করার পর মাসুদ আগের মতোই বলল, “টাকাটা পরে দেব।” সেই মুহূর্তে জামশেদের মাথায় যেন হঠাৎ একটা সিদ্ধান্ত পাকাপাকি হয়ে গেল।

পরদিন সকাল। মাসুদ আগের মতোই দোকানে ঢুকে বলল, “ভাই, একটু বসি?” এবার জামশেদ হাসলেন না। শান্ত গলায় বললেন, “মাসুদ ভাই, একটা কথা বলি? এই দোকানটা আমার। এখানে কম্পিউটারের কাজ হয়। জমির অফিস না।” মাসুদ একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “আরে ভাই, আমি তো শুধু বসি…” জামশেদ এবার স্পষ্ট করে বললেন, “না ভাই, শুধু বসেন না। আমার কাস্টমারও নিয়ে যান। এটা ঠিক না।”

দোকানে তখন কয়েকজন মানুষ দাঁড়িয়ে ছিল। সবাই চুপ করে শুনছিল। কিছুক্ষণ চুপ থাকার পর মাসুদ বলল, “তা হলে আজ থেকে আর বসব না?” জামশেদ খুব শান্তভাবে বললেন, “আজ থেকে না, এখন থেকেই না।”

মাসুদ আর কিছু বলল না। ফাইলটা হাতে নিয়ে ধীরে ধীরে দোকান থেকে বের হয়ে গেল।

মাসুদ ছিল বড্ড বখাটে লোক। কয়েকদিন খুব ঝামেলা সৃষ্টি করেছিল জামশেদ এর দোকান বাজার থেকে উঠিয়ে দিতে। কিন্তু কথায় বলে, “রাখে আল্লাহ্ মারে কে?” মাসুদ কিছুই করতে পারে না। অবশেষে অবশেষে ২০২৪ সালে জামশেদ মাসুদকে দোকান থেকে সরাতে সক্ষম হয়। জামশেদ একটু স্বস্তি ফিরে পায়। মনে মনে ভাবে, এবার বুঝি একটু কাষ্টমারের মুখ দেখা যাবে।

এরপর কয়েকদিন বাজারে একটু আলোচনা হয়েছিল ঠিকই, কিন্তু সব আবার স্বাভাবিক হয়ে গেল। আর সেই ঘটনার পর জামশেদ নিজের জন্য একটা নিয়ম বানালেন। কেউ যদি দোকানে এসে বলে, “ভাই, একটু বসি?”—তিনি ভদ্রভাবে বলেন, “দুঃখিত, এখানে বসার ব্যবস্থা নেই।”

আর কেউ যদি কোনো কাজ করাতে আসে, তিনি হাসিমুখে বলেন, “কাজ হলে অবশ্যই করে দেব। তবে সবার মতোই ন্যায্য মূল্য দিতে হবে।”

জামশেদ এখন মাঝে মাঝে মজা করে বলেন, “আগে একটা ভুল করেছিলাম—দোকানের চেয়ারকে খুব বেশি দয়া দেখিয়েছিলাম। এখন শিখেছি, দোকান ব্যবসার জায়গা, দয়ার জায়গা না।”

কারণ তিনি নিজের অভিজ্ঞতা থেকে বুঝেছেন—একবার যদি ভুল করে কাউকে জায়গা দেন, তাহলে একসময় দেখবেন আপনার দোকান, কিন্তু ব্যবসা অন্যের। তাই এখন তিনি স্পষ্টভাবে বলেন, “বসতে দেব না, অফিস খুলতেও দেব না। কাজ করাতে চাইলে ন্যায্য মূল্য দিয়ে করাতে হবে—যেমন অন্য কাস্টমাররা করে।”

এই ছোট্ট শিক্ষাটাই জামশেদের কাছে এখন সবচেয়ে বড় অভিজ্ঞতা। আর বাজারের নতুন দোকানদাররা যখন তার গল্প শোনে, তখন তারা হাসে ঠিকই, কিন্তু মনে মনে একটা কথাই ভাবে—দালালকে জায়গা দিলে একসময় দোকানটাই তার হয়ে যেতে পারে।

আহমেদ সুমন এর একটি লেখা বই রয়েছে। বইটির নাম “না বলতে শিখুন” । বইটি পড়লে আপনি শিখতে পারবেন কিভাবে কাউকে না বলতে হয়। যদি আপনি না বলা শিখতে না পারেন তবে জামশেদ এর মতই আপনাকে সমস্যায় পড়তে হবে। মাত্র ১৩৫ টাকায় আপনি রকমারিতে বইটি পেয়ে যাবেন!

বইটি কেনার লিংক: https://rkmri.co/l3mA3Ae50MME/

 



Last Update: 6 months ago

 

Casio Original Calculator

Casio Original Calculator

পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর

About মহসিন উদ্দিন 30 Articles
মহসিন উদ্দিন একজন ব্লগার। ‍যিনি ২০১৩ সাল থেকে ব্লগিং করেন।

Be the first to comment

Leave a Reply

Your email address will not be published.


*


This site uses Akismet to reduce spam. Learn how your comment data is processed.