ছোটবেলার সেই দিনগুলোতে “লোডশেডিং” শব্দটা যেমন বিরক্তির ছিল, তেমনই ছিল এক অদ্ভুত আনন্দেরও নাম। আজকের মতো সারাদিন বিদ্যুৎ থাকত না। হঠাৎ করে সন্ধ্যার পরেই পুরো এলাকা অন্ধকারে ডুবে যেত। কিন্তু সেই অন্ধকার আমাদের ভয় দেখাত না, বরং এক অন্যরকম জাদুময় পরিবেশ তৈরি করত। ঘরের বাতি নিভে গেলে প্রথমে একটু হৈচৈ হতো—“আরে কারেন্ট চলে গেল!”—কিন্তু তারপরই শুরু হতো আসল মজা। নানা ধরনের গল্পের আসর বসত তখন।
মা তখন তাড়াতাড়ি করে মোমবাতি বা হ্যারিকেন জ্বালাতেন। সেই হালকা হলুদ আলোয় পুরো ঘরটা যেন বদলে যেত। দেয়ালে ছায়া নড়ত, জানালার ফাঁক দিয়ে হালকা বাতাস ঢুকত, আর বাইরে কোথাও কোথাও ঝিঁঝিঁ পোকার ডাক শোনা যেত। এইসব মিলিয়ে একটা রহস্যময় অথচ আরামদায়ক পরিবেশ তৈরি হতো। আমরা সবাই তখন এক জায়গায় জড়ো হয়ে বসতাম—কেউ মাটিতে, কেউ খাটে, কেউ আবার মায়ের পাশে গা ঘেঁষে।

GearUP K60 Rechargeable Flashlight 10W
উজ্জ্বল আলোয় ভরা ১৫০০ মিটার রেঞ্জের এই লাইটটি অনেকেই সোশ্যাল মিডিয়ায় দেখে থাকবেন। আলোচিত এই লাইটটি রাতে অনেক দূর পর্যন্ত পথ দেখায়। সাথে আছে COB লাইট, যা দিয়ে পড়ালেখা থেকে শুরু করে অনেক কাজ সেরে ফেলা যায়।
লোডশেডিং মানেই ছিল গল্পের আসর। দাদী বা নানী শুরু করতেন পুরোনো দিনের গল্প—কখনো তাদের ছোটবেলার কথা, কখনো কোনো গ্রামের ঘটনা, আবার কখনো কোনো ভূতের গল্প। আমরা গোল হয়ে বসে সেই গল্প শুনতাম, আর মাঝে মাঝে ভয় পেয়ে একে অপরের হাত ধরে ফেলতাম। কেউ কেউ আবার সাহস দেখিয়ে বলত—“এইসব কিছুই না, আমি ভয় পাই না!” কিন্তু হঠাৎ করে বাইরে কোনো শব্দ হলেই সেই সাহসী মানুষটাই চমকে উঠত।
শুধু বড়রাই না, আমরাও গল্প বানিয়ে বলতে শুরু করতাম। কেউ বানাতো মজার গল্প, কেউ রহস্যের, কেউ আবার এমন গল্প বানাতো যে শুনে সবাই হেসে লুটোপুটি খেত। সেই হাসির শব্দ, সেই আনন্দ—সবকিছুই যেন অন্ধকার ঘরটাকে ভরিয়ে তুলত। তখন মনে হতো, এই সময়টা যেন কখনো শেষ না হয়।
লোডশেডিংয়ের সময়টাতে আমরা অনেক সময় আকাশের দিকে তাকিয়ে থাকতাম। যদি বাইরে একটু খোলা জায়গা থাকত, তাহলে সবাই মিলে উঠানে চলে যেতাম। আকাশভরা তারা, চাঁদের আলো—এইসব দেখতে দেখতে সময় কেটে যেত। এখনকার মতো এত আলো ছিল না, তাই আকাশটাও ছিল অনেক পরিষ্কার। তারা গুনতে গুনতে কখন যে সময় চলে যেত, তা টেরই পেতাম না।
এই সময়টাতে অনেক মজার খেলাও খেলতাম আমরা। “ছায়া দিয়ে বিভিন্ন আকৃতি বানানো”, “লুকোচুরি”, বা শুধু অন্ধকারে বসে গল্প করা—এইসবই ছিল আমাদের বিনোদন। বিদ্যুৎ না থাকলেও আমাদের আনন্দে কোনো কমতি ছিল না। বরং মনে হতো, এই সময়টাই আমাদের জন্য সবচেয়ে বিশেষ।
মাঝে মাঝে মা ডাক দিতেন—“চল, খেয়ে নে।” মোমবাতির আলোয় খাওয়া-দাওয়ার সেই অভিজ্ঞতাও ছিল অন্যরকম। ভাত, ডাল, ডিম ভাজি—এই সাধারণ খাবারগুলোও তখন অসাধারণ লাগত। খাওয়ার পর আবার একটু আড্ডা, তারপর ধীরে ধীরে ঘুমের প্রস্তুতি।
ঘুমাতে যাওয়ার সময়ও সেই মোমবাতির আলো বা হ্যারিকেনের আলো জ্বলত। বিছানায় শুয়ে আমরা ভাবতাম—কবে কারেন্ট আসবে? আবার কেউ চাইত—না, কারেন্ট না আসুক, এই অন্ধকারটাই থাকুক! কারণ এই অন্ধকারের মধ্যেই তো ছিল এত আনন্দ, এত গল্প, এত হাসি।
আরো পড়ুন:- নব্বইয়ের দশক: সেই সোনালি দিনের গল্প
কিছুক্ষণ পর হঠাৎ করে যখন বিদ্যুৎ ফিরে আসত, তখন পুরো এলাকা যেন একসাথে চিৎকার করে উঠত—“কারেন্ট আসছে!” কেউ খুশি হতো, কেউ আবার একটু মন খারাপ করত। কারণ সেই মোমবাতির আলোয় বসে থাকা, সেই গল্পের আসর—সবকিছু যেন হঠাৎ করেই শেষ হয়ে যেত।
LR-2018 USB Rechargeable Folding Fan with LED Light
এই গরমে রিচার্জেবল ফ্যানটি (লাইট সহ) ১৬৬৪ টাকার পরিবর্তে ডিসকাউন্ডে পাচ্ছেন ৭৪৯ টাকায়। এখনি কিনুন রকমারি থেকে
আজকের দিনে এসে লোডশেডিং প্রায় নেই বললেই চলে। বিদ্যুৎ থাকে সারাক্ষণ, আর আমাদের জীবন হয়ে গেছে অনেক সহজ। কিন্তু সেই সহজ জীবনের মধ্যে কোথাও যেন হারিয়ে গেছে সেই ছোট ছোট আনন্দগুলো। এখন আর কেউ মোমবাতির আলোয় বসে গল্প করে না, কেউ উঠানে বসে তারা গোনে না, কেউ একসাথে বসে হাসে না।
মোবাইল, টিভি, ইন্টারনেট—সবকিছু আমাদের জীবনে ঢুকে পড়েছে। আমরা ব্যস্ত হয়ে গেছি নিজেদের দুনিয়ায়। কিন্তু সেই লোডশেডিংয়ের রাতগুলো আমাদের শিখিয়েছিল—আনন্দ পেতে খুব বেশি কিছু লাগে না। লাগে শুধু কিছু প্রিয় মানুষ, আর একটু সময়।
মাঝে মাঝে খুব ইচ্ছে করে, যদি আবার সেই দিনগুলো ফিরে পাওয়া যেত! আবার যদি এক সন্ধ্যায় হঠাৎ করে কারেন্ট চলে যেত, আর আমরা সবাই মিলে মোমবাতির আলোয় বসে গল্প করতাম! আবার যদি সেই হাসি, সেই ভয়, সেই আনন্দ—সবকিছু একসাথে অনুভব করা যেত!

লোডশেডিংয়ের সেই রাতগুলোর সবচেয়ে সুন্দর দিক ছিল—মানুষের কাছে মানুষ হয়ে ওঠা। আজকের মতো তখন কেউ নিজের মোবাইল নিয়ে আলাদা হয়ে যেত না, বরং বিদ্যুৎ চলে গেলেই সবাই এক জায়গায় এসে বসত। পাশের বাসার কাকু, চাচি, খালারা পর্যন্ত এসে যোগ দিতেন আড্ডায়। মনে হতো, পুরো পাড়াটা যেন এক পরিবার হয়ে গেছে। অন্ধকার যেন দূরত্ব কমিয়ে দিত, সম্পর্কগুলোকে আরও কাছে এনে দিত।
মাঝে মাঝে কেউ একজন হারমোনিয়াম বা গিটার নিয়ে বসে যেত। শুরু হতো গান—পুরোনো বাংলা গান, লোকগীতি, কিংবা কারো নিজের গাওয়া গান। সবাই মিলে তালি দিত, কেউ কেউ আবার গলা মিলিয়ে গাইত। সেই সুর, সেই পরিবেশ—সবকিছু মিলিয়ে মনে হতো যেন ছোট্ট একটা সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান চলছে। কোনো আয়োজন ছিল না, তবুও সেই আয়োজনের আনন্দ ছিল অফুরন্ত।
কখনো কখনো লোডশেডিংয়ের সময় আমরা খেলতাম “অন্ধকার খেলা”—যেখানে আলো না থাকায় সবাইকে খুঁজে বের করতে হতো শুধু শব্দ শুনে। কেউ হেসে ফেললে তাকে ধরে ফেলা সহজ হতো। এইসব খেলায় হাসির রোল পড়ে যেত। কেউ পড়ে যেত, কেউ ধাক্কা খেত, কিন্তু তাতে কারো কোনো রাগ থাকত না—বরং এসব নিয়েই মজা চলত আরও বেশি।
বয়স্করা তখন নানা উপদেশ দিতেন। জীবনের গল্প, অভিজ্ঞতা, শিক্ষা—এইসব কথা আমরা তখন হয়তো পুরোপুরি বুঝতাম না, কিন্তু সেই কথাগুলো মনে কোথাও একটা জায়গা করে নিত। আজ যখন বড় হয়েছি, তখন বুঝতে পারি—সেই লোডশেডিংয়ের রাতগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় শেখার সময়গুলোর একটি।
বৃষ্টির দিনে যদি লোডশেডিং হতো, তাহলে সেই রাতটা হয়ে উঠত আরও বিশেষ। বাইরে ঝুম বৃষ্টি, ভেতরে মোমবাতির আলো—এই পরিবেশে গল্প শুনতে বা আড্ডা দিতে যে কি ভালো লাগত, তা ভাষায় প্রকাশ করা কঠিন। মাঝে মাঝে বজ্রপাত হলে ঘর আলোকিত হয়ে উঠত, আর সবাই একসাথে চমকে উঠত। তারপর আবার হাসাহাসি—এইসব ছোট ছোট মুহূর্তগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে বড় আনন্দ।
রাত যত গভীর হতো, আড্ডাটাও তত গভীর হতো। কেউ চুপচাপ বসে থাকত, কেউ ভাবনায় ডুবে যেত, কেউ আবার গল্পের পর গল্প বলে যেত। সময় যেন থেমে থাকত সেই মুহূর্তে। কারো তাড়া ছিল না, কোনো ব্যস্ততা ছিল না—শুধু ছিল কিছু মানুষের একসাথে থাকা।
অনেক সময় আমরা ছাদে উঠে যেতাম। সেখানে বসে দূরের অন্ধকার শহর বা গ্রামকে দেখতাম। কোথাও কোথাও ছোট ছোট আলো জ্বলত, আবার কোথাও পুরো অন্ধকার। সেই দৃশ্যগুলো খুব শান্ত, খুব সুন্দর লাগত। মনে হতো, পুরো পৃথিবীটাই যেন একটু ধীর হয়ে গেছে।
কিছু কিছু রাত ছিল, যখন বিদ্যুৎ অনেক দেরিতে আসত। তখন আমরা একসময় ক্লান্ত হয়ে পড়তাম, আর ধীরে ধীরে ঘুমিয়ে যেতাম। মোমবাতির আলো নিভে যেত, হ্যারিকেনের আলো ম্লান হয়ে আসত, আর আমরা ঘুমের দেশে চলে যেতাম। সেই ঘুমটা ছিল খুব গভীর, খুব শান্ত—যেন কোনো চিন্তা নেই, কোনো দুশ্চিন্তা নেই।
আজকের দিনে দাঁড়িয়ে সেই রাতগুলোর কথা ভাবলে একটা অদ্ভুত অনুভূতি হয়। তখন হয়তো আমরা বুঝতাম না, কিন্তু এখন বুঝি—সেই সময়গুলো কতটা মূল্যবান ছিল। এখন আমাদের জীবনে আলো অনেক বেশি, কিন্তু সেই আলোর মাঝেই কোথাও যেন অন্ধকারে বসে থাকা সেই সুখটা হারিয়ে গেছে।
লোডশেডিংয়ের সেই রাতগুলো আমাদের শিখিয়েছিল—একসাথে থাকলে অন্ধকারও সুন্দর হতে পারে। শিখিয়েছিল, আনন্দের জন্য প্রযুক্তি লাগে না, লাগে শুধু কিছু প্রিয় মানুষ আর একটু সময়। সেই সময়গুলো হয়তো আর কখনো ফিরে আসবে না, কিন্তু সেই স্মৃতিগুলো চিরদিন আমাদের সাথে থাকবে।
সত্যিই, মোমবাতির আলোয় বসে থাকা সেই গল্পের আসরগুলোই ছিল আমাদের জীবনের সবচেয়ে উজ্জ্বল মুহূর্ত—যেগুলো আজও মনে পড়লে হৃদয়ের কোথাও একটা আলো জ্বলে ওঠে।
Last Update: 6 months ago
Casio Original Calculator
পরীক্ষার হলে একটি ভালোমানের ক্যালকুলেটর খুব জরুরী। তাই আজই কিনে নিন ক্যাসিও অরজিনাল ক্যালকুলেটর
Leave a Reply